বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, গত বছর জুলাই-আগস্টে এক গণআন্দোলনের জেরে যাকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয় এবং দেশ ছাড়তে হয়। সেই থেকে শেখ হাসিনা ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন এবং এক অজ্ঞাত স্থানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয়ে রয়েছেন। তাঁর অজ্ঞাতবাস বা ভারতে আশ্রয়কালের প্রথম ছয় মাস তিনি একেবারেই অন্তরালে ছিলেন। তাঁর কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কিন্ত ধীরে ধীরে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন, তবে সশরীরে নয় তাঁর আওয়াজের মাধ্যমে। তিনি আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিতে একের পর এক অডিও বার্তা দিতে শুরু করেন। যা বাংলাদেশে এবং বিদেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি আওয়ামী লীগ সভ্য-সমর্থকদের জন্য ভোকাল টনিক হিসেবে কাজ করেছে। এরপর তিনি একাধিক আন্তর্জাতিক এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিতে শুরু করলেন। যা নিয়েও কম রাজনৈতিক চর্চা হয়নি। সব শেষে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেত্রী তথা বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লিতে একটি প্রকাশ্যে সাংবাদিক সম্মেলনে ভার্চুয়াল বক্তৃতা দেন। তবে সশরীরে নয়, তিনি অডিও মাধ্যমেই ভাষণটি দিয়েছিলেন। মজার বিষয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই হাসিনার এই অডিও বার্তা নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নয়া দিল্লিকে আপত্তি জানিয়েছে। শেখ হাসিনার মুখ বন্ধ করার আর্জি জানিয়েছে বারবার। কিন্তু সে গুড়ে বালি, দিল্লি ঢাকার কোনও চিঠিরই জবাব পর্যন্ত দেয়নি। এবার শেখ হাসিনা এক ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জি ২৪ ঘণ্টাকে একান্ত সাক্ষাৎকার দিলেন। তাতে তিনি যা যা বলেছেন, সেটা গোটা পরিস্থিতিকে এক অন্যমাত্রা দিতে পারে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
জি ২৪ ঘণ্টাকে শেখ হাসিনা যা যা বলেছেন, তার মধ্যে যে মন্তব্য সবচেয়ে নজরকাড়া তা হল বিএনপিকে নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া। তিনি বলেন, বিএনপি যদি সরকার গঠন করে, আমি আশা করব তারা আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে। হাসিনার মতে, প্রকৃত বিরোধী দল ছাড়া সংসদ কখনও সংসদ হতে পারে না। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বাংলাদেশে পা রাখার পর আপনার প্রথম অগ্রাধিকার কী হবে? এর জবাবে হাসিনা বলেন, আমার প্রথম এবং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হবে, সংবিধানসম্মত শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা। কারণ, গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ কার্যত আইনের বাইরে চলছে। তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশে মব-সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত গ্রেফতার, গণহারে আটকের মাধ্যমে প্রায় এক লক্ষ বাহান্ন হাজার মানুষ মিথ্যা রাজনৈতিক মামলায় কারাবন্দি। যাঁদের অনেকেই নির্মম নির্যাতনের শিকার। তাঁদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া জরুরি। আবার ইউনূসের আমলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, সেটা নিয়েও তাঁর পরবর্তী পরিকল্পনা জানান আওয়ামী লীগ নেত্রী। তিনি বলেন, ইউনূস যে সর্বনাশ করে গিয়েছেন, তা মেরামত করাই আমাদের দায়িত্ব। হাসিনার কথায়, ইউনূসের আমলে বাংলাদেশে আজ আইনের শাসন নেই—আছে শুধু মব-সন্ত্রাস।
তবে যে কথাগুলি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, তা আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত বিএনপিকে নিয়ে বলা মন্তব্যগুলি। যেমন বিএনপি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জিতে যদি সরকার গঠন করে তাহলে তাঁরা আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে বলেই আশা প্রকাশ করেছেন শেখ হাসিনা। আবার অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, এই ক্ষত সারাতে হলে গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট-সম্পন্ন সরকার দরকার। আওয়ামী লীগ সরকারে হোক বা বিরোধী দলে—দেশের সেবা করতে প্রস্তুত। কিন্তু নিষিদ্ধ ও নির্যাতিত অবস্থায় সেটা সম্ভব নয়। স্বদেশ থেকে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেত্রী হাসিনার এ হেন মন্তব্যগুলি থেকেই স্পষ্ট, তিনি আশা প্রকাশ করছেন এই নির্বাচনে না হলেও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তাঁর দলের উপর থাকা যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। ফলে আওয়ামী লীগ আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বমহিমায় ফিরবে। তাঁর তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সংসদীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রীতি। শক্তিশালী বিরোধিতা শাসনব্যবস্থাকে আরও মজবুত করে।
তবে বিএনপির ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিয়ে জি ২৪ ঘণ্টাকে তিনি বলেছেন, বিএনপির চরমপন্থী শক্তির সঙ্গে আপস করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলেও শেখ হাসিনা বলেছেন, আমি আশা করব তারা আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে। প্রকৃত বিরোধী দল ছাড়া সংসদ কখনও সংসদ হতে পারে না। অর্থাৎ, ভোটের আগেই একটার পর একটা আবেগী তাস খেলছেন বাংলাদেশ থেকে কার্যত বিতাড়িত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনেকেই মনে করছেন, ভারতের কলকাঠিতেই তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর পর বাংলাদেশে ফিরতে পেরেছেন সকল বাধা কাটিয়ে। তাই এরমধ্যে কোনও একটা সেটিং তত্ত্ব রয়েছে। এই আবহেই সোমবার বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি মন্তব্য ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শোরগোল শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, এতদিন নির্বাচন মানে লড়াই হতো আওয়ামী লিগের নৌকার সঙ্গে বিএনপির ধানের শীষের। এবার নতুন একটি দল ময়দানে এসেছে, যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। তাঁর মন্তব্যের মূল সুর ছিল, জামায়াতের তুলনায় আওয়ামী লিগ ভাল ছিল। ফলে বোঝাই যাচ্ছে আসল খেলাটা কোথায়, কেনই বা এত স্বাভাবিক রয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীরা।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। ভোট অবাধ ও সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে সশস্ত্র বাহিনীকে...
Read more












Discussion about this post