বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একের পর এক গণমাধ্যমে ইন্টারভিউ দিয়ে চলেছেন। কখনো তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অথবা ভারতীয় গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। বলা ভালো তিনি এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনও সংবাদমাধ্যমে মুখ খোলেননি। গত শুক্রবার দিল্লি হরেন পরসপন্ডের ক্লাব অফ সাউথ এশিয়ার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অডিও বার্তা দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী তথা বাংলাদেশের ক্ষমতার যুদ্ধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপরেই তিনি ভারতীয় গণমাধ্যম জি ২৪ ঘণ্টাকে সাক্ষাৎকার দিলেন। প্রসঙ্গত কোন ক্ষেত্রেই তিনি ক্যামেরার সামনে আসেননি। কখনো তিনি অডিও বার্তা দেন, আবার কখনও ইমেইল মারফত প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। জি ২৪ ঘণ্টাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি বেশ কয়েকটি বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন।
শেখ হাসিনা এই সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, বিএনপি যদি সরকার গঠন করে, আমি আশা করব তারা আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে। তাঁর আরও দাবি, প্রকৃত বিরোধী দল ছাড়া সংসদ কখনও সংসদ হতে পারে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, এটা অন্তত একটা সুচতুর মন্তব্য। কারণ এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কোন সুযোগ নেই আওয়ামী লীগের পক্ষে। তবে হাসিনা তার একাধিক ভাষণে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের উদ্দেশ্যে নির্দেশ দিয়েছেন ভোট বয়কটের। এক্ষেত্রে তো স্লোগান- “নো বোট, নো ভোট”। জানা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেত্রী তথা বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই আহবানে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। কিন্তু ভারত সরকার আপাতত অথবা স্বল্প মেয়াদী প্রকল্পে বাংলাদেশে তারেক রহমানের বিএনপিকে সমর্থন করার বার্তা দিচ্ছে। কারণ আওয়ামী লীগকে কোন প্রকার সুযোগ দিতে নারাজ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। হাসিনার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার এই কারণেই গভীর তাৎপর্য বহন করছে।
উল্লেখ্য বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী কে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম প্রশ্ন করেছিল, বাংলাদেশে পা রাখার পর আপনার প্রথম অগ্রাধিকার কী হবে? এর জবাবে হাসিনা বলেছেন, আমার প্রথম এবং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হবে, সংবিধানসম্মত শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তাঁর দাবি, বিগত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশে মব-সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত গ্রেফতারএবং গণহারে আটক করছে ইউনূস সরকার। তাঁর আরও দাবি, বাংলাদেশের গোটা গণতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আজও প্রায় এক লক্ষ বাহান্ন হাজার মানুষ মিথ্যা রাজনৈতিক মামলায় কারাবন্দি।যাঁদের অনেকেই নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এরপরই শেখ হাসিনার তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য, ইউনূস যে সর্বনাশ করে গিয়েছেন, তা মেরামত করাই আমাদের দায়িত্ব। এবারই প্রথম তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী একটা দিশা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার দাবি, বাংলাদেশে তাঁর আমলে গড়ে ওঠা দ্রুতগতির অর্থনীতি থমকে গিয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ। যুবসমাজ, কৃষক ও শ্রমিক—কারও জন্যই কাজ নেই। রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি আক্রান্ত, সংখ্যালঘুরা প্রতিদিন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। দেশে আজ আইনের শাসন নেই, আছে শুধু মব-সন্ত্রাস। অর্থাৎ তিনি ইউনূস সরকারের অপশাসনকে তুলে ধরেছেন।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে কেন শেখ হাসিনাকে পরবর্তী লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন করা হল! তাহলে তাকে কি খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেখা যাবে? এই মুহূর্তে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ বাংলাদেশ রাজনৈতিক কার্যক্রমের জন্য নিষিদ্ধ আবার তাদের ছাত্রলীগ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার দোসর জামাত কোনভাবেই চায় না আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। তাই তাদের নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে বাইরেই রাখা হয়েছে। তাহলে কেন শেখ হাসিনা পরবর্তী সরকার নিয়ে কথা বলছেন? তারা ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য কি কি করতে চায় সেটা নিয়ে কেন কথা বললেন শেখ হাসিনা? আসলে এটাই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়।
শেখ হাসিনার দাবি, বাংলাদেশের চরমপন্থী শক্তিগুলি, যাদের অনেকের সঙ্গেই নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের যোগ রয়েছে, তারা আজ সম্পূর্ণ মুক্ত। প্রকাশ্যেই তাঁরা নিজেদের অপরাধের কথা স্বীকার করছে, কিন্তু ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে কোনো কথাই বলছে না। আসলে আওয়ামী লীগ নেত্রী সুব্রতলীভাবে ইউনুসের আমলে বাংলাদেশে বেড়ে চলা জঙ্গি কার্যকলাপ নিয়ে বহির্বিশ্বের নজর কাড়তে চাইছেন। যা ভারতের দাবিকে মান্যতা দেয়। এই মুহূর্তে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন বাংলাদেশ অতি সক্রিয়। তাৎপর্যপূর্ণভাবে তিনি বিএনপি বা অন্যান্য রাজনৈতিক দল, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস এবং বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির সঙ্গেও আলাদা আলাদা বৈঠক করেছেন। একমাত্র তিনি বৈঠক করেননি বাংলাদেশের কট্টরপন্থী ইসলামিক সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের আগে যে ধরণের ঘোঁট পাকছে, তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে গণভোট। যা মুহাম্মদ ইউনূসের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে লাল সতর্কতার সামিল। আর সেই দিক থেকে শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকার নতুন করে চাপ সৃষ্টি করল ইউনূস সাহেবের জন্য।












Discussion about this post