সেই ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে পরবর্তী আঠারো মাসের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে এমন এক শাসনব্যবস্থা ছিল যেখানে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা সবই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। অর্থাৎ, মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার ঠিক করে দিত সবকিছুই। আর এই সুযোগে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক ও নেতা-নেত্রীকে জেলে ভরেছিল পুলিশপ্রশাসন। আর আওয়ামী লীগের যে সমস্ত নেতারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন তাঁদের বিরুদ্ধে শতশত মামলা দিয়ে তাঁদের ইহোকাল-পরকাল ঝড়ঝড়ে করে দেওয়ার ব্যবস্থা পাকা করেছিল ইউনূসের সরকার। এখন বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত সরকার শপথ নিয়েছে। বাংলাদেশের মসনদ থেকে মুহাম্মদ ইউনূস বিদায় নেওয়ার পর এসেছেন খালেদা জিয়ার পূত্র তারেক রহমান। ফলে আইনের শাসন কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি তারেক রমহানের নির্দেশে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় কড়া নির্দেশিকাও জারি করেছে যেন আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খুলে যাচ্ছে, সেখানে সকাল-বিকাল লীগের কর্মী সমর্থকরা আসা-যাওয়াও করছেন। এই পরিস্থিতিতে এমন একটি খবর সামনে এল যা দিন বদলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার ভাটারা থানার তিন পৃথক হত্যা মামলা থেকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৪৯৪ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। আদালতের সামনে তাঁদের বক্তব্য, তিনটি হত্যা মামলাতেই ‘তথ্যগত ভুল ছিল’। সোজা কথায় সেগুলি ছিল ভুয়ো মামলা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এটা সবে শুরু। গোটা বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায় এমনই হাজার হাজার ভুয়ো মামলা দায়ের করা হয়েছিল আন্দোলনকারী ছাত্রজনতা এবং অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নির্দেশে। যা নিয়ে তখনও বিতর্ক হয়েছিল, এখনও চলছে। কিন্তু দু-কান কাটা ইউনূস এবং তাঁর সাগরেদরা সে সব বিতর্কে কান না দিয়ে আওয়ামী লীগকে পুরো ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার বন্দোবস্তে লেগে ছিলেন। কিন্তু এখন বাংলাদেশের ক্ষমতায় একটি নির্বাচিত সরকার। আবার বিএনপির সংগঠন গোটা বাংলাদেশেই ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁদের দায়বদ্ধতা অনেক বেশি। সেই দিক থেকে এবার বাংলাদেশে আইনের শাসন ফেরা সময়ের অপেক্ষা বলেই দাবি করেছিল রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আর সেটা এখন দৃশ্যমান।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালদের মতো আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের এরকম একাধিক মামলায় নাম রয়েছে। তেমনই ভাটারা থানা এলাকায় পৃথক তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাঁদের নাম ছিল। তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় ‘তথ্যগত ভুল’ উল্লেখ করে আদালতে এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বসুন্ধরা গেট এলাকায় ককটেলের আঘাতে নিহত হন ট্রাক চালক মো. জাহাঙ্গীর, কলের মিস্ত্রী জাকির হোসেন এবং কারখানার শ্রমিক রমজান মিয়া জীবন। এই ঘটনায় পরবর্তী সময় ভাটরা থানায় বাংলাদেশের পূর্বতন প্রথানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-সহ ৮৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। ঘটনার এতমাস পর মূলত সরকার পরিূবর্তনের পর তদন্তকারী আধিকারিকরা আদালতে জানাল, ঘটনার সময়কার বিশৃঙ্খলায় সুনির্দিষ্ট কার আদেশে বা কার আঘাতে মৃত্যু হয়েছে, তার কোনও অকাট্য সাক্ষী বা ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়নি। অথচ, ইউনূসের আমলে এই সমস্ত মামলায় কারও জামিন পর্যন্ত হয়নি। বলা হচ্ছে গোটা বাংলাদেশে এমন ধরণের কয়েক হাজার মামলা রয়েছে। পুলিশের ফাইনাল রিপোর্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উল্লেখ করা হয়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রে ঘটনাস্থল নিয়ে অসংগতি পাওয়া গেছে। যেমন নিহতরা অনেকেই ভিন্ন জায়গায় মারা গিয়েছেন। আবার একই ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় বিভিন্ন শহরে মামলা দায়ের হয়েছে। এর ফলে মামলার সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে ইউনূসের আমলে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারী উল্লেখ করে মামলা দায়ের হয়েছিল। ফলে পরবর্তী সময় পুলিশ ইচ্ছামতো আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ধরে মামলায় যুক্ত করে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের দাবি, ভাটরা থানার ঘটনা হয়তো শুরুয়াত, এবার একে একে অনেক মামলাতেই আওয়ামী লীগের নেতারা জামিন পেতে শুরু করবেন।












Discussion about this post