২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মার্চ মাসের মধ্যে বেশ কয়েকটি জাতীয় ও আঞ্চলিক সংস্থার যৌথভাবে সংকলিত একটি গোপন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ইসলামী চরমপন্থী কার্যকলাপের উদ্বেগজনক পুনরুত্থান প্রকাশ পেয়েছে। যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য হুমকি বলেই দাবি করা হয়েছে ওই রিপোর্টে। ওই গোয়েন্দা রিপোর্টে হিযবুত তাহরীর, ইসলামিক স্টেট এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কিছু উপাদান নিয়ে গঠিত একটি কট্টরপন্থী ইসলামপন্থী নেটওয়ার্ক কীভাবে ঢাকার যুবসমাজ এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে তাদের আদর্শ পুনর্গঠন করছে তা তুলে ধরা হয়েছে। এই নেটওয়ার্কটিকে তথাকথিত তৌহিদী জনতাকে পরিচালিত করছে। তাঁদের একত্রিত করে আরও বড় কোনও লক্ষ্যে পরিচালিত করছে বলে ওই রিপোর্টে উল্লেথ করা হয়েছে। এরাই সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের সুফি মাজার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও তাঁদের উপাসনালয়ে হামলা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে হামলার জন্য দায়ি। গোয়েন্দা রিপোর্টে আরও বিস্ফোরক কিছু দাবি করা হয়েছে। যেমন, ঢাকার শাহবাগ থানা, র্যাব সদর দফতর এমনকি কাশিমপুর কারাগারের সামনেও অবরোধ করেছিল এই নেটওয়ার্ক। এরাই মূলত প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টারের মতো মূলধারার সংবাদপত্রের অফিসেও হামলা চালিয়েছে। আরও গুরুতর অভিযোগ হল, এই ইসলামিক নেটওয়ার্ক গত ছয় মাসে বাংলাদেশ জুড়ে ৫০টিরও বেশি পাবলিক “ধর্মীয়” সেমিনার আয়োজন করেছে। সেখানে নামমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়েছে, বাকি সময় ইসলামিক চরমপন্থী আদর্শের বাণী ছড়িয়ে নতুন সদস্য জোগাড় করা, যাচাই করা ও নিয়োগের ব্যবস্থা হয়েছে। এটা একদিকে যেমন বাংলাদেশের জন্য চরম হুমকি, তেমনই ভারতের জন্য।
সম্প্রতি বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তার শিরোনাম হল, গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডানপন্থিদের উত্থান নিয়ে আলোচনা কেন? মূলত ইসলাম পন্থী ভাবধারার সংগঠনগুলির বিষয়েই আলোচনা করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফকরুল আলমগীরের এক সাক্ষাৎকার ছেপেছে বাংলাদেশের প্রথমসারির দৈনিক প্রথম আলো। সেখানে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তাহলে কি আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর দেশের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থীদের উত্থান হতে যাচ্ছে? বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বিষয়টি আলোচনায় এনেছেন। আপনি কী দেখেন? এর উত্তরে মির্জা ফকরুল বলেন, আমিও দেখছি। সে জন্য আমি উদ্বিগ্ন। আমি বাংলাদেশকে সব সময় একটা সত্যিকার অর্থে উদারপন্থী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ হিসেবে দেখতে চাই এবং এখানে গণতন্ত্র হবে সবচেয়ে বড় বিষয়। সেই জায়গায় যদি এখন এমন এমন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হয়, যারা গণতন্ত্রেই বিশ্বাস করে না। পরিষ্কার ঘোষণা দিয়ে করে না। আবার তারা নিজেরা জোর করে চাপিয়ে দিতে চায় মতবাদকে, এটা নিঃসন্দেহে এলার্মিং সিচুয়েশন।
বোঝাই যাচ্ছে বাংলাদেশের পরিস্থিতি দিনে দিনে অত্যন্ত খারাপের দিকে যাচ্ছে। এই বিষয়ে ভারত যেমন প্রথম থেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এবার ধীরে ধীরে পশ্চিমা দেশগুলিও উদ্বিগ্ন হতে শুরু করেছে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন খুব সম্প্রতি বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে সরাসরি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গত এক বছরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বিতর্কিত নানা কর্মকাণ্ডে ইসলামপন্থিদের যুক্ত থাকার অভিযোগ শোনা গিয়েছে। যদিও ইসলামপন্থি দলগুলি এই দাবি নাকচ করে দিয়েছে। তাঁদের দাবি, গত ১৫ বছর যে গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে, ফ্যাসিবাদের পতনের পর তারা সেই অধিকার ফিরে পেয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অগাস্টের অভ্যুত্থানের পর দেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে সেটার সুযোগ নিচ্ছে ইসলামপন্থি সংগঠনগুলো। তাঁদের দাবি, এর প্রভাব কতদূর গড়াবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচন পরবর্তী সরকার গঠনের ওপর। গত ১৯শে জুলাই স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী। সেই সমাবেশে দলটির নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, “আগামী দিনের জাতীয় সংসদে শুধুমাত্র ইসলাম চলবে। কোরান এবং সুন্নাহর আইন চলবে। গত মাসের ২৮ তারিখে একই জায়গায় মহাসমাবেশ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। গত ৩ মে নারী সংস্কার কমিশন বাতিল-সহ চার দফা দাবিতে মহাসমাবেশ করে কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। ফলে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডানপন্থি তথা ইসলামপন্থিদের উত্থান হচ্ছে এ কথা অনস্বীকার্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই গোয়েন্দা রিপোর্ট নয়া দিল্লিতে যথাস্থানে পৌঁছে গিয়েছে। ভারত সরকার সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও জিহাদিদের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান এখন স্পষ্ট করে দিয়েছে অপারেশন সিঁদূরের পর। এ কথা বলাই যায়, গভীর সংকটে বাংলাদেশ।












Discussion about this post