“আমাদের আত্মহত্যা করা উচিৎ, নয়তো মাঠে নেমে লড়াই করা উচিৎ”। “মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আর দ্বিতীয় কোনও কথা আবারও যুদ্ধের ডাক দিব, শহীদ হলে হয়ে যাব”! এই ধরণের টুকরো মন্তব্যকে অস্বীকার করলে ভুল হবে। কারণ, এই ধরণের মন্তব্য আসছে বাংলাদেশের বিশিষ্টজন বা বুদ্ধিজীবী মহল থেকেই। যারা একসময় জুলাই আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন, যারা প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে সমর্থন করেছিলেন। তাঁরাই এখন অতিষ্ট এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং তাঁদের আড়ালে থাকা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিগুলির জন্য। বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং নাগরিক কমিটির মতো অকিঞ্চিৎকর সংগঠনের প্রতি। আসন্ন আগস্ট মাসের ৫ তারিখ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঘটা করে গণঅভ্যুত্থান দিবস পালন করতে চলেছে। প্রায় একমাস ব্যাপী নানান উৎসব ও কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে সেই উৎসাহ কোথায়? কোথায় হারিয়ে গেল সেই উৎসাহ, উদ্দিপণা? কারণ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ তো কিছুদিন আগেই বুঝে গিয়েছিলেন, তাঁদের হাল তো ফেরেইনি, বরং আরও খারাপের দিকে গিয়েছে। এবার বুঝতে শুরু করেছেন বাংলাদেশের বিশিষ্টজনেরা। কিছুটা ভয়, কিছুটা আশার আলো দেখে যারা এতদিন মুহাম্মদ ইউনূসকে সমর্থন দিয়ে গিয়েছেন, তাঁরাই এখন সমালোচনায় মুখর হচ্ছেন বিভিন্ন সভায়। ক্রমশ কোনঠাসা হচ্ছেন মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গোরা। তাই তাঁরা তড়িঘড়ি জুলাই সনদ বা জুলাই ঘোষণাপত্র দিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানকেই পাল্টে দিতে মরিয়া।
তীব্র ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে গত বছরের গত বছর বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। অন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নোবেলজয়ী ডঃ মহম্মদ ইউনুস হন প্রধান উপদেষ্টা। গোটা বাংলাদেশ তখন আশা করেছিল এবার সোনার বাংলাদেশ গঠিত হবে। কারণ, ক্রমাগত প্রচারের ফলে ততক্ষণে শেখ হাসিনার কপালে জুড়ে গিয়েছে স্বৈরাচারি তকমা। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, ততই বাংলাদেশের জনগণ বুঝতে পেরেছে প্রকৃত স্বৈরাচারি কারা। যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এবং হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিজের জীবন দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিলেন। আজ ৫৪ বছর পর এসে তাঁরাই দেশবিরোধী তকমা পাচ্ছেন। আবার সে সময় যারা মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি পদে বাঁধার সৃষ্টি করেছিলেন, তাঁরাই এখন বীরের মর্যাদা পেয়ে জেল থেকে ছাড়া পাচ্ছেন, বা সম্মানিত হচ্ছেন। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজরিত ৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরাল ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া। সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর চরম অত্যাচার করে, খুন, ধর্ষণ করে বাংলাদেশে কার্যত তালিবান শাসনের কাছাকাছি নিয়ে আসা। সবই হচ্ছে নতুন বাংলাদেশে। কারও বুঝতে আর বাকি নেই, এসব কারা করাচ্ছে, কেন করাচ্ছে। ফলে বুদ্ধিজীবী মহল এবং বিশিষ্টজনেরা এবার ক্ষিপ্ত হচ্ছেন। যে কারণে ক্রমশ একঘরে হয়ে পড়ছেন ইউনূসবাহিনী। সবচেয়ে মজার বিষয়, তাঁদের যারা পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা মূলত কেউ ফ্রান্স বা আমেরিকায় বসে আছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তাঁরা ক্রমাগত উস্কানি বা কু-পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। আর সেটা মেনেই চলছে জাতীয় নাগরিক পার্টির অর্বাচীন কিছু নেতা-সমন্বয়করা।
এতদিন মুহাম্মদ ইউনূস এনসিপি নেতাদের দাবি-দাওয়া মেনেই শাসন করতেন। কিন্তু তিনি ইদানিং অন্য খেলায় মেতেছেন। লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের পরই আগামী বছর ফেব্রুয়ারির মধ্যে জাতীয় নির্বাচনে রাজি হয়েছেন। যা মোটেই মেনে নিতে পারছেন না জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতৃত্ব। লালমনিরহাট শহরের মিশন মোড় চত্বরে জুলাই পদযাত্রার আয়োজন করেছিল এনসিপি। সেখানেই বক্তব্য রাখতে গিয়ে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম কার্যত হুঁশিয়ারি দিলেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে। তিনি বলেন, একটি সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের জন্য যে মৌলিক সংস্কারের প্রয়োজন, তা সম্পূর্ণ করতে হবে। জুলাই সনদ এই মাসেই আদায় করতে হবে। রাজপথে নামা তারই অংশ। নতুন সংবিধান, জুলাই ঘোষণাপত্র এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা-সহ তাঁর সহযোগীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। গত ১৬ বছরে আওয়ামি লিগ সরকার জনগণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে।
বোঝাই যাচ্ছে এই নতুন রাজনৈতিক দলটির মূল উদ্দেশ্যই হল নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে বিপথে চালিত করা। সংস্কারের নামে বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে তালিবানি শাসন প্রবর্তন করা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তানের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া। যা কোনও মতেই মেনে নিতে পারছেন না বাংলাদেশের কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা। ফলে লড়াই এখনও বাকি।












Discussion about this post