এলাকা ঘন জঙ্গলে ঘেরা। এখানে সূর্যোদয় যেমন অনেক আগে হয়, সূর্য অস্ত যায় খুব তাড়াতাড়ি। অন্ধকার নেমে এলে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে নানা ধরনের সরীসৃপ। আর শোনা যায় অস্ত্রের ঝনঝনানি। দিন পেরিয়ে রাত এলে গোলা আর বারুদের ঝাঁঝালো গন্ধে শান্ত পাহার হয়ে ওঠে অশান্ত। রাত যত গভীর হয়, সেই গন্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। সীতাকুণ্ডু উপজেলায় সলিমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ভৌগলিকভাবে যতটা বিচ্ছিন্ন অপরাধ কাঠামোয় ততটাই সংগঠিত। চার দশক ধরে পাহাড় কেটে এখানে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। পাহাড় কাটা থামেনি কখনই। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা হয়েছে আরও পরিকল্পিত ও সংগঠিত। পাহাড় কেটে জমি সমতল করে প্লট আকারে বিক্রি, বিদ্যুৎ-জল নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা – সব মিলিয়ে জঙ্গল সলিমপুর আজ একটি পূর্ণাঙ্গ ছায়া অর্থনীতির কেন্দ্র, একটি ‘নিষিদ্ধ ভূখণ্ড’। এ অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে গড়ে তোলা হয়েছে নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী।
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামি থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে, এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে প্রায় তিন হাজার ১০০ একরের সরকারি খাসজমি নিয়ে বিস্তৃত জঙ্গল সলিমপুর। এই দুর্গম এলাকায় ঢুকলে বোঝা যায় এটি আর পাঁচটি এলাকার মতো নয়। এখাকার বাসিন্দাদের রয়েছে পরিচয়পত্র। প্রবেশমুখে লোহার গেট, পাহাড়ের ঢালে ঢালে পাহাড়া। লোহার গেটে দেখাতে হবে পরিচয়পত্র। না দেখাতে পারলে এই এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ। অচেনা কাউকে দেখলে মুহূর্তে চারপাশ থেকে ভেসে আসে সতর্কসংকেত। বিভিন্ন সূত্র বলছে, এই জঙ্গল সলিমপুর চার দশক ধরে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে একটি অঘোষিত রাষ্ট্র। যেখানে রাষ্ট্রীয় আইন নয়। এখানে চলে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিজস্ব নিয়ম।
এলাকা সবসময় কড়া পাহাড়ায় থাকে। পাহাড়ের ওপর থেকে নজরদারি করা হয় প্রতিটি চলাচলের ওপর। প্রশাসনের গাড়ি ঢুকলেই পাহারাদারদের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ। এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল ২০২৩-য়ে। সেই প্রথম একটি অঘোষিত রাষ্ট্রের ভয়াবহতা জাতীয় পর্যায়ে প্রথম আলোচনায় আসে। ২০২৩-য়ের ১৪ সেপ্টেম্বর এখান চলে উচ্ছেদ অভিযান। অভিযান শেষ করে ফিরছিলেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ওপর ফারুক, সীতাকুণ্ড থানার তৎকালীন ওসি তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। সরকারি কর্তাদের লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয় ককটেল, বৃষ্টির মত পড়তে শুরু করে ইট। হামলা হয়েছিল তার আগের বছর। র্যাব এবং পুলিশের ওপর এই নিষিদ্ধ নগরীর বাসিন্দারা হামলা চালায়। সর্বশেষ হামলার ঘটনাটি ঘটে গত ১৯ জানুয়ারি। অস্ত্র উদ্ধার ও আসামী গ্রেপ্তার অভিযানে গিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসী হামলায় র্যাব- ৭-য়ের ডিএডি আব্দুল মোতালেব খুন হয়ে যান। আহত হন আরও তিন র্যাব সদস্য ও একজন সোর্স। র্যাবের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় ১৯ জানুয়ারি বিকেলে চারটের নাগাদ অভিযান চলে। সেই সময় সেখানকার একটি মসজিদ থেকে মাইকে ঘোষণা করা হয় অভিযানের খবর। আর খবর পাওয়া মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ জন সন্ত্রাসী সরকারি কর্তাদের ঘিরে ধরে। পাহাড়ের আড়াল থেকে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চলে। গুলিতে খুন হন আব্দুল মোতালেব। আর তাঁর সঙ্গে থাকে তিন র্যাব সদস্য এবং এক সোর্সকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মম নির্যাতন চালায়। পরে বিশাল পুলিশ বাহিনীর সাহায্যে তাদের উদ্ধার করা হয়।
র্যাব পরিচালক একে এম শহিদুর রহমান বলেন, ‘এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে। একটি একটি দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা বেশ কঠিন। তবে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ করছে। ’
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post