কালাই উপজেলা বাংলাদেশের দরিদ্রতম অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি। এই এলাকায় বাইগুনী গ্রাম এক অন্য কারণে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে। হত দরিদ্র এই গ্রামকে গোটা বাংলাদেশ এখন “এক কিডনির গ্রাম” বলে চেনে। না কোনও গুরুতর অসুস্থতা নয়, এই বাইগুনী গ্রামের ৮০ শতাংশ বাসিন্দা নিজেদের একটি কিডনি বিক্রি করে দিয়েছেন শুধুমাত্র টাকা রোজগারের জন্য। ২০২৩ সালে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল গ্লোবাল হেলথে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কালাই উপজেলায় প্রতি ৩৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে একজন কিডনি বিক্রি করেছেন। বিষয়টি এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ, যে এর সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের একাধিক দুষ্ট চক্র জড়িত রয়েছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের নামী সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে দাবি করা হয়েছে, দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে কলাই উপজেলার বাইগুনি গ্রামের মানুষজনদের প্রভাবিত করে কিডনি বিক্রি চক্রটি কাজ করে আসছে।
বাংলাদেশের জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার বাইগুনি গ্রাম। গোটা গ্রামেই দরিদ্রতার ছাপ। এই গ্রামের বাসিন্দা সফিরুদ্দিন পরিবারকে অনটন থেকে মুক্ত করতে এবং তিন সন্তানের জন্য একটি বাড়ি তৈরি করতে ২০২৪ সালে নিজের একটি কিডনি বিক্রি করেছিলেন ভারতের এক ব্যক্তির কাছে। বিনিময়ে তিনি পান সাড়ে ৩ লক্ষ টাকা। এটা একটা উদাহরণ মাত্র, আসলে এই গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ, সে মহিলা হোক না পুরুষ, তাঁরা নিজের একটি কিডনি বিক্রি করে দিয়েছেন দালাল চক্রের পাল্লায় পড়ে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, তাঁরা কিডনি বিক্রি করেছেন বেশিরভাগ ভারতীয় ক্রেতার কাছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদক ওই এলাকার বহু কিডনি দাতার সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের দাবি, বাংলাদেশের দালালরা প্রথমে তাঁদের সামনে টাকার টোপ দেন। এরপর নানারকম লোভ দেখানো হয়। তারপরে কোনও এক স্থানে মেডিকেল পরীক্ষা করানো হয়। শেষে তিন থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তখনই আগুপিছু না ভেবে পরিবারের সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধির কথা চিন্তা করে তাঁরা রাজি হয়ে যান। এরপর সেই দালালরা সেই ব্যক্তির পাসপোর্ট থেকে শুরু করে অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি করে দেন, এবং ভারতে নিয়ে আসেন।
জানা যায়, মূলত মেডিকেল ভিসায় তাঁদের ভারতে আসা হয়। কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য হাসপাতাল সংক্রান্ত সব কাগজপত্র, ভুয়া আইডি, নকল জন্মসনদ বা নোটারি সার্টিফিকেটও বানানো হয়। তারপরে কিডনি বিক্রি হয়ে গেলে, তাঁদের ফের সীমান্ত পার করিয়ে দেওয়া হয়। এক কিডনিদাতার দাবি, ভারতে যাওয়া এবং ফেরার সময় তাঁর কাছে পাসপোর্ট ছিল। কিন্তু যেই তিনি বাংলাদেশের মাটিতে ঢুকে পড়লেন, তাঁর পাসপোর্ট, প্রেসক্রিপশন ও অন্যান্য মেডিকেল সার্টিফিকেট সব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁকে কি কি ওষুধ খেতে হবে সেটাও তিনি জানেন না। এটাই মূলত ওই কিডনি পাচার চক্রের কাজের ধরণ। হলে হতদরিদ্র ওই পরিবার গুলির একজন বা দুজন সদস্য একটি করে কিডনি হারিয়ে কার্যত কর্মক্ষম হয়ে রয়েছেন। একটি কিডনি বিক্রি করে এককালীন সাড়ে তিন থেকে চার লক্ষ টাকা পেলেও কাজের অভাবে বা নানা কারণে সেই টাকা শেষ। হলে ওই পরিবারগুলি আরো অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
ওয়াকিবহাল মহলের বক্তব্য, দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক আন্তর্জাতিক কিডনি পাচার চক্র বাংলাদেশের দরিদ্রতম জেলা গুলিতে সক্রিয়। তাদের প্রথম পছন্দ ভারত। কলকাতা বা ভারতের অন্যান্য শহরের কিডনি চক্রগুলোর সঙ্গে এরা জড়িত। এক একটি কিডনি বিক্রি করে মোটা মুনাফা অর্জন করে তারা। কিন্তু যার থেকে কিডনি নেওয়া হচ্ছে সে খুব কম অর্থই হাতে পায়। এই মুহূর্তে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে অবনতি হওয়ায় ভারত বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা বন্ধ করেছে। এমনকি মেডিকেল ভিসা দিতেও যথেষ্ট কড়াকড়ি করছে ভারত। যার ফলে এই কিডনি পাচার চক্র গুলি এই মুহূর্তে অকেজো হয়ে রয়েছে। সেই কারণেই কলাই উপজেলার বাইগুনি গ্রাম খবরে শিরোনামে উঠে এসেছে।












Discussion about this post