“দীর্ঘস্থায়ী”, “গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত”, “অংশীদারিত্ব”, “সংহতি”, “অংশীদারীত্ব” এবং “ঐতিহাসিক” – এই শব্দগুলি আফ্রিকার দেশগুলির সাথে ভারতের সম্পর্ক বর্ণনা করার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এক দশক আগেও তা বলা হতো না। কারণ কংগ্রেস আমলে ভারত শুধু ঘরোয়া রাজনীতি নিয়েই ব্যাস্ত থাকতো, ভূ-রাজনীতি নিয়ে কংগ্রেসের কোনও মাথাব্যাথা ছিল না। কিন্তু কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারত বিশ্ব রাজনীতির এক “গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়” হিসেবে উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সুদূরপ্রসারী কয়েকটি সিদ্ধান্ত ভারতকে এক শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে, যে এখন চিন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর সঙ্গেও চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস দেখাচ্ছে।
যে আফ্রিকাকে অন্ধকারময় মহাদেশ হিসেবে বর্ণনা করা হতো, এখন সেই আফ্রিকা ভূ রাজনীতির অন্যতম মাঠে পরিণত হয়েছে। কারণ আদিম আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশেষ করে রিয়ার আর্থ মিনারেলস বা বিরল খনিজ ভর্তি আফ্রিকায়। যেমন আর্থ ম্যাগনেট, লিথিয়াম, ইউরেনিয়াম, গোল্ড ইত্যাদি। ইউরোপীয় দেশগুলি কয়েক শতক ধরে আফ্রিকার দেশগুলিতে উপনিবেশিকরণ করে রেখেছিলো। তাঁরা নিজেদের মতো করে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করেছে। এখনও করছে। এর মধ্যে চিন তাঁর বিস্তারনীতি নিয়ে ঋণের ফাঁদে আফ্রিকার দেশগুলিকে কব্জা করেছে। এ সব থেকে উদ্ধারের উপায় কেউ বলেনি। যা একমাত্র ভারত করেছে।
যে বছর ভারত জি-২০ গ্রূপের সভাপতিত্ব করেছিল, সেবারই ভারত আফ্রিকান ইউনিয়নকে জি-২০ গ্রূপের স্থায়ী সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই অক্ষ একটি অভিজাত বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম যা লক্ষ লক্ষ আফ্রিকানদের প্রভাবিত করে এমন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই উপকার ভুলতে পারবে না আফ্রিকান ইউনিয়ন ভুক্ত দেশগুলি। এরপর ভারত কৌশলগতভাবে বিভিন্ন আফ্রিকান দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। যার ফায়দা এবার নিতে শুরু করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
সম্প্রতি পাঁচ দেশের ঐতিহাসিক সফরে রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ৯ দিনের এই পাঁচ দেশ সফর – যা তাঁর দীর্ঘতম বিদেশ সফরগুলির মধ্যে একটি। বলা ভালো এর আগে তিনি কোনও বারই এতদিন ভারতের বাইরে থাকেননি। তাই এই সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২ থেকে ৩ জুলাই তিনি পশ্চিম আফ্রিকার একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ঘানায় ছিলেন। এটি তিন দশকের মধ্যে প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফর। ঘানা পশ্চিম আফ্রিকার দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতির একটি দেশ। যা স্বর্ণ খনির জন্য বিখ্যাত। ভারত ঘানার রপ্তানির বৃহত্তম গন্তব্য; ঘানা থেকে ভারতের মোট আমদানির ৭০ শতাংশরও বেশি সোনা। উল্লেখ্য, খাঁটি সোনা সেমি কনডাক্টর তৈরি করার জন্য অন্যতম উপাদান। প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ঘানার সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে এই সফরে। সূত্রের খবর জ্বালানি, প্রতিরক্ষা এবং উন্নয়ন সহযোগিতা-সহ “বিরল খনিজ” নিয়ে ঘানার সঙ্গে একাধিক ঐতিহাসিক চুক্তিও করেছেন নরেন্দ্র মোদি।
প্রধানমন্ত্রী ২০২৪ সালের নভেম্বরে ক্যারাবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত গায়ানা সফর করেছিলেন। সেই দেশে সদ্য পাওয়া জ্বালানি তেল নিয়ে ভারত চুক্তিও করেছিল। যা নরেন্দ্র মোদির সুদূরপ্রসারী নীতির অংশ ছিল। এই সফরে তিনি আরেক ক্যারিবিয়ান দ্বীপ ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে গেলেন। যেখানে প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ ভারতীয় বংশদ্ভুত মানুষের বাস। সে দেশের প্রধানমন্ত্রী কমলা পারসাদ-বিসেসার এবং রাষ্ট্রপতি ক্রিস্টিন কার্লা কাঙ্গালু উভয়ই ভারতীয় বংশোদ্ভূত। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায় ভারত তাঁর পদক্ষেপ বিস্তার করছে ধীরে ধীরে। উল্লেখ্য, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত ও ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর মধ্যে মোট বাণিজ্য ৩৪১.৬১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
৪-৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী মোদি আর্জেন্টিনা সফর করছেন। রিয়ার আর্থ মিনারেলসে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের এই দেশ সমৃদ্ধ। জানা যাচ্ছে, আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতিজাভিয়ের মাইলির সাথে প্রতিরক্ষা, কৃষি, খনি, তেল ও গ্যাস, জ্বালানি ইত্যাদি ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করবেন নরেন্দ্র মোদি। উল্লেখ্য, আর্জেন্টিনায় লিথিয়মের ভাণ্ডার রয়েছে, যা মোবাইল ও ইলেকট্রিক ভেহিকেলের ব্যাটারি তৈরির অন্যতম উপাদান। ভারতে এখন আইফোন-সহ একাধিক মোবাইল প্রস্তুতকারক সংস্থা কারখানা চালু করে দিয়েছে। ফলে লিথিয়াম ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ হবে ভারতের জন্য। যা ভারতের সবুজ শক্তি পরিবর্তনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পাশাপাশি আর্জেন্টিনা ভারতে সয়াবিন এবং সূর্যমুখী তেলের একটি প্রধান সরবরাহকারী। ২০২৪ সালে, ভারত ছিল আর্জেন্টিনার পঞ্চম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। এই দুটি খাদ্যপণ্য নিয়েই ভারতকে বাণিজ্য চুক্তি করতে বেশি চাপ দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
আর্জেন্টিনা সফর সেরে তিনি ৫-৮ জুলাই ব্রাজিলে যাবেন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে। এই সম্মেলন রিও ডি জেনেরিও শহরে হবে। উল্লেখ্য, অপারেশন সিঁদুর পরবর্তী ব্রিকস সম্মেলন ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনকে চাপে রাখার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করবেন বলেই মত কূটনৈতিক মহলের। অপরদিকে ব্রাজিল দক্ষিণ আমেরিকায় ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। এবারের সফরে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার সাথে দেখা করবেন নরেন্দ্র মোদি। তাঁদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ব্রাজিল ভারতের আকাশ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমস ও ব্রহ্মস মিসাইল কিনতে আগ্রহী।
এরপর প্রধানমন্ত্রী মোদি ৯ জুলাই নামিবিয়া সফর করবেন। ভারতীয় কোম্পানিগুলি সম্প্রতি নামিবিয়ায় খনি, উৎপাদন, হীরা প্রক্রিয়াকরণ এবং পরিষেবায় বিনিয়োগ করেছে। আফ্রিকার এই দেশেও বিপুল পরিমান বিরল খনিজ রয়েছে। যা ভারতের লক্ষ্য। সবমিলিয়ে তাঁর এই পাঁচটি ক্ষুদ্র দেশ সফর নিছক লোক দেখানো নয়।
চিন আফ্রিকার দেশগুলিতে তাঁর বেল্ট এন্ড রোড ইনিসিয়েটিভ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু বেশিরভাগ দেশই গৃহযুদ্ধে আবদ্ধ। কিন্তু ভারত সেই দেশগুলির মধ্যে মধ্যস্ততা করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধ থামিয়ে উন্নয়নের রাস্তায় নিয়ে এসেছে। ইতিমধ্যেই রেল শিল্পে ভারত আফ্রিকায় পা রেখেছে। চিনের বিনিয়োগ ছিনিয়ে এনে ভারত রেল ইঞ্জিন, রেল কামরা রফতানি শুরু করেছে আফ্রিকার কয়েকটি দেশে।
বাইট – নরেন্দ্র মোদি
আগামীদিনে আফ্রিকা হবে বিশ্বের অন্যতম বাজার। যা নরেন্দ্র মোদি বহু আগেই অনুমান করেছিলেন। ফলে চিনকে টেক্কা দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আফ্রিকার দেশগুলিতে ভারতের বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। আম্বানি, আদানি বা টাটা গোষ্ঠী আফ্রিকায় বিপুল বিনিয়োগ করছে। যা ভারতেরই অর্থনীতি মজবুত করছে, আর ভারতকে বিশ্ব বাজারে এক শক্তিশালী দেশে পরিণত করছে।












Discussion about this post