পাক গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স, যা আইএসআই নামে কুখ্যাত, সেই আইএসআই এবার ঘাঁটি গেড়েছে বাংলাদেশে। জানা গিয়েছে, গত বছরের অক্টোবর মাসেই আইএসআই তাঁদের ‘ঢাকা সেল’ খুলে ফেলেছে। এর জন্য ঢাকার সচিবালয়ে কোনও এক নিরাপদ জায়গায় গোপন কার্যালয়ও চালু করেছে পাক গুপ্তচর সংস্থা। একাধিক গোয়েন্দা রিপোর্ট উল্লেখ করে ভারতের একাধিক গণমাধ্যমের দাবি, চিরাচরিত নাশকতার ছক নয়, আইএসআইয়ের ঢাকা সেলের লক্ষ্যে একটু ভিন্ন। জানা গিয়েছে, জঙ্গি অনুপ্রবেশ বা স্লিপার সেল-এর মতো চেনা মোডাস অপারেন্ডির বাইরে গিয়ে ভারতকে অশান্ত করতে নতুন ছক কষছে তাঁরা। আসলে বাংলাদেশকে ভরকেন্দ্র করে ভারতে অশান্তি ছড়ানোই এই সেলের মূল উদ্দেশ্য। ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জায়গায় কয়েকটি অশান্তির খবর নিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দারা চিন্তিত। যার পিছনে পাক আইএসআইয়ের হাত রয়েছে বলেই জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা। অর্থাৎ, কোনও নাশকতার ছক নয়, দীর্ঘমেয়াদী অশান্তির ছক কষা হচ্ছে ভারতের একাধিক স্থানে। প্রথাগত ছকের বাইরে গিয়ে একটা “ন্যারেটিভ” তৈরি করাই পাক আইএসআইয়ের মূল উদ্দেশ্য বলে জানতে পেরেছে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি।
তদন্তকারীদের সূত্র ধরে ভারতের একাধিক গণমাধ্যমের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল ও ইরানে এই ধরণের “ন্যারেটিভ” বা বিশেষ ছক লক্ষ্য করা গিয়েছে। এই ছক অনুসারে প্রথমে কোনও একটা বিষয়কে সামনে রেখে সরকারবিরোধী একটা ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়। তারপর সেই ন্যারেটিভকে ছড়িয়ে দেওয়া হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে। এর পর ধীরে ধীরে সেই দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়। যেমনটা হয়েছে শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং ইরানে। বাংলাদেশও সেই দিকে এগোচ্ছে। এবার বাংলাদেশকে মাঝে রেখে ভারতকেও অস্থিতিশীল করার চেষ্টায় রয়েছে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। উল্লেথ করা যেতে পারে, ভারতের তিন প্রতিবেশী বাংলদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং নেপালে সরকারের পতন হয়েছে এক প্রবল গণবিক্ষোভের মধ্যে দিয়ে। আর এই তিনটি দেশই আর্থিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে দুর্বল, নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে। এরই সুযোগে লস্কর, জৈইসের মতো একাধিক জঙ্গিগোষ্ঠী সেই দেশে নিজেদের ঘাঁটি বানিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করে দিয়েছে। তবে আইএসআইয়ের ঢাকা সেলের কাজ একটু ভিন্ন। তাঁদের লক্ষ্য হল, ভারতে একটা সরকারবিরোধী তীব্র ন্যারেটিভ তৈরি করা। যার ফলে কেন্দ্রের মোদি সরকারকে দুর্বল করে ব্যতিব্যস্ত করে রাখা। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভারতে সিঁদ কাটতে চায় লস্কর বা জৈইসের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলি।
তবে ভারতের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি আগেভাগেই টের পেয়ে গিয়েছে পাকিস্তানের এই ছক। তাঁদের মতে, ২০১৪-য় শ্রীলঙ্কায় এমন একটা প্যাটার্ন প্রথম দেখা গিয়েছিল। প্রথমে শ্রীলঙ্কাকে অশান্ত করে সেখানে ঘাঁটি গাড়ে পাক আইএসআই। কলম্বোয় অবস্থিত পাক হাইকমিশনের কার্যালয় থেকে দক্ষিণ ভারতে একটা সরকারবিরোধী ন্যারেটিভ তৈরি করে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই চেষ্টা বানচাল করে দিয়েছিল ভারতের তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ। এরপর বাংলাদেশেও একই কায়দায় হাসিনা সরকারকে ফেলে দেওয়া হল ২০২৪ সালে। তারপরের বছরই নেপালেও একই কায়দায় নির্বাচিত সরকার ফেলে দেওয়া হল। পরের লক্ষ্য যে ভারত তা আর বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। আর এই কাজটাই করছে আইএসআইয়ের ঢাকা সেল।
উল্লেখ্য, গত বছর জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ-র হাতে গ্রেফতার হয়েছিল বাংলাদেশের সন্ত্রাসী সংগঠন ‘আনসারুল্লা বাংলা টিম’ বা এবিটি-র মাস্টারমাইন্ড সাদ রাডি। এর পরে গোয়েন্দাদের জালে ধরা পড়ে মিনারুল শেখ এবং মহম্মদ আব্বাস আলি নামে আরও দুই জঙ্গি। তারপরই ছবিটা স্পষ্ট হয় ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে। ধৃতদের জেরা করে এবং তাঁদের ফোন থেকে এনক্রিপ্টেড মেসেজ উদ্ধার করে গোয়েন্দারা জানতে পারেন, ভারতের বিভিন্ন স্থানে আর্থিক ভাবে দুর্বল পরিবারের তরুণদের সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে নিজেদের দলে টানার ছক কষেছিল আইএসআইয়ের ঢাকা সেল। সম্প্রতি বাংলাদেশে ছাত্রনেতা শরিফ ওসমান হাদির হত্যার সঙ্গে সুকৌশলে ভারতের নাম জুড়ে দিয়ে যে ভারতবিরোধী প্রচার চালানো হচ্ছিল সেটা পাক আইএসআইয়ের কৌশল ছিল বলেই জানা গিয়েছে। সূত্রের দাবি, ‘ঢাকা সেল’-কে মজবুত করতে হালফিলে সক্রিয় হয়েছে পাকিস্তান। আইএসআই-এর ডিজি মেজর জেনারেল শাহিদ আমির আফসার ছাড়াও পাক সেনার একজন ব্রিগেডিয়ার, একজন কর্নেল এবং চার জন মেজর পদমর্যাদার অফিসারকে এই সেলে রাখা হয়েছে। গত ডিসেম্বরে এই সেলে যোগ দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমন আজ়মি। তাঁর মূল কাজ হলো বাংলাদেশে সক্রিয় মৌলবাদী সংগঠনগুলির সঙ্গে ‘ঢাকা সেল’-এর সমন্বয় স্থাপন করা। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, মিথ্যা ন্যারেটিভ তৈরি করে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় অশান্তি ছড়ানোই হল আইএসআইয়ের ঢাকা সেলের মূল কাজ। তবে এই দিকে কড়া নজর রাখছেন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি। ফলে এই ধরণের কাজ খুব একটা সহজ হবে না পাকিস্তানের।












Discussion about this post