জায়গাটা পদ্মা নদীর ঠিক ধারে। কয়েক মাস আগেও এখানে শোনা যেত ভারী ভারী ক্রেনের শব্দ। সেই শব্দে কান পাতা দায় হয়ে যেত। এখন সেখানে শ্মশানের নিস্তব্ধতা। বাংলাদেশের স্বপ্নের প্রকল্প – রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০২৫ –য়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল। মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়িয়ে করা হয়েছে ২০২৮। কিন্তু ২০২৮-য়েও শেষ হবে কি না, তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ রয়েছে। কারণ, তদারকি সরকার থেকে এর জন্য যে টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল, তার পরিণাম বৃদ্ধি পেয়েছে ১১.৮৪ %। টাকার অঙ্কে ১, ১৩,০৯৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১, ২৬, ৪৭৯ কোটি টাকা। রাশিয়া থেকে এই প্রকল্পের জন্য ঋণের পরিমাণ ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলার। গত জুন পর্যন্ত এই প্রকল্পের জন্য খরচ করা হয়েছে ৮.২৯ বিলিয়ন ডলার।
২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে ৮.২৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে, যেখানে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮০ টাকা। পরের তিন বছরের জন্য অবশিষ্ট ৩.০৯ বিলিয়ন ডলারের বিনিময় হার ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা অনুসারে ১২২ টাকা। এদিকে মূল প্রকল্প প্রস্তাবে সরকারের নিজ তহবিল থেকে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২২ হাজার ৫৩ কোটি টাকা, যা সংশোধিত পরিকল্পনায় কিছুটা বেড়ে ২২ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা হয়েছে। ২০১৬ সালের মূল প্রস্তাবে এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৯৩ কোটি টাকা। প্রকল্পটির জন্য রাশিয়ার ঋণের পরিমাণ ডলারের হিসাবে ১১.৩৮ বিলিয়ন ডলার। সেটি অপরিবর্তিত থাকছে। তবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ মূল পরিকল্পনার ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লক্ষ ৪ হাজার ৪ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ শুধু বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণেই ব্যয় বেড়েছে ১২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা।
এছাড়া পূর্ত কাজ, যন্ত্রপাতি আমদানি, প্রযুক্তিগত পরামর্শক, নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ খাতে ব্যয় বেড়েছে। নতুন নকশা অনুযায়ী, নিরাপত্তা অবকাঠামো, পরিবেশ মনিটরিং ও সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের কারণেও ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এই সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য শুধু ব্যয় বাড়ানো নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করে প্রকল্পকে টেকসই ও কার্যকরভাবে চালু করা। সংশোধিত প্রস্তাবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ইউনিট ও পরামর্শক খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রূপপুর কেন্দ্রের সিডি-ভ্যাট খাতে বরাদ্দ ১৭৮.৪০ কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট ৩৭৮.৪০ কোটি টাকা করা হয়েছে। ঠিকাদারের আমদানিকৃত বেশ কিছু সরঞ্জাম ২০২৬ ও ২০২৭ সালে সরবরাহ করা হবে। ৪ হাজার ১৮৫ ইউনিট অফিস সরঞ্জামের জন্য ৩৭.৭৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। ভবিষ্যতে অফিস সম্প্রসারণ ও বাজারমূল্য বৃদ্ধি বিবেচনা করে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৫০ কোটি টাকা করা হয়েছে। ১০২টি যানবাহনের জন্য ৬৭.১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। তবে বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী মোট ১০০টি যানবাহনের প্রয়োজন, যার জন্য বরাদ্দ বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এতো গেল খরচ খরচার হিসেব। কিন্তু বরাদ্দ বৃদ্ধি করার পরেও কি এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে?
এক কথায় না বলা যেতে পারে। প্রজেক্টের আউটপুট শূন্য। হঠাৎ কেন সব কিছু মাঝপথে থমকে গেল? সরকারের তরফে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রকল্প শেষ হওয়ার মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য তদারকি সরকার থেকে সংশ্লিষ্টমহলকে নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। তারপরেও কাজ শেষ না হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কারণটা কোনও যান্ত্রিক গোলোযোগ নয়, কারণটা হল একটি সিদ্ধান্ত। নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর রাশিয়ার হলেও এর প্রাণভোমরা ছিল ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারদের হাতে। তারা প্রকল্প থেকে হাত তুলে নিয়েছে। ভারত কেন হাত তুলে নিল?
আসলে ভারত যে হাতে বাংলাদেশকে খেতে দিয়েছে, সেই হাতে তারা কামড় বসিয়েছে। বিগত কয়েক মাসে পদ্মাপারে যা হয়েছে, তা সকলের জানা। সে দেশের উঠতি নেতাদের মুখে সেভেন সিস্টার্স কেড়ে নেওয়ার হুমকি। ভারতের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য, সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতন, তাদের পিটিয়ে মারা। সব কিছুর স্পনসর ছিল তদারকি সরকার। এই সব দাঁড়ি-গোঁফহীন নেতাদের বিরুদ্ধে তদারকি সরকার প্রধান কোনও পদক্ষেপ করেনি। উল্টে তাদের পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দিয়ে গিয়েছে। ইউনূস এবং তাঁর পারিষদবর্গ বুঝতে ভুল করেছিল। ভারত আর সেই পুরনো ভারত নেই। এই ভারত আত্মনির্ভর ভারত। এক গালে চড় মারলে আরেকটি গাল বাড়িয়ে দেবে না।












Discussion about this post