২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বড় ধরনের টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে বাংলাদেশ এবং ভারতের সম্পর্কে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু নির্যাতন, সীমান্ত উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক তলবে মধ্যে দিয়েই কেটেছে বিগত দেড় বছর। এবার বাংলাদেশে থাকা ভারতের দূতাবাস এবং উপদূতাবাসগুলিতে কর্মরত কূটনৈতিক ও আধিকারিকদের পরিবারকে দ্রুত দেশে ফিরে আসার পরামর্শ দিয়েছে নয়া দিল্লি। বলা হচ্ছে, সাম্প্রতিক অতীতে এটাই ভারতের সবচেয়ে কড়া কূটনৈতিক পদক্ষেপ। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একাধিক বিষয়ে টানাপোড়েন চলছে। সর্বশেষ বিবাদ শুরু হয়েছে ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে। আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতে খেলতে আসতে নারাজ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। বলা ভালো ক্রিকেট বোর্ডের আড়ালে যাবতীয় কলকাঠি নাড়ছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্রীড়া ও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এমনকি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনও এই বিষয়ে নিজের ভূমিকা রাখছেন। ঠিক এই আবহে বিবিসি ইন্ডিয়াকে একটি সাক্ষাৎকার দিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তাতে তিনি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের জন্য শেখ হাসিনাকেই দায়ী করেছেন।
বিগত আঠারো মাসে একটা বিষয় স্পষ্ট, বাংলাদেশে যা কিছু ঘটুক বা ভারতের সাথে যে ধরণেরই কূটনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি হোক না কেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সে সবের পিছনেই শেখ হাসিনাকে দায়ী করতে চেয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস থেকে শুরু করে স্বারাষ্ট্র, পররাষ্ট্র বা আইন উপদেষ্টা সকলেই যেন হাসিনা ও ভারতকে একাসনে বসিয়ে দিতে মরিয়া। ফলে ক্ষমতার বাইরে গিয়েও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী প্রশাসন যথাসম্ভব ভারত-বিরোধিতাকে সামনে নিয়ে এগোতে চেয়েছে। আর বিকল্প হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে ইউনূসের প্রশাসন দহরম মহরম বাড়িয়েছে। এই আবহেই বিবিসি ইন্ডিয়াকে সাক্ষাৎকার দিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। এই সাক্ষাৎকারটি বিবিসি ইন্ডিয়া ২১ জানুয়ারি তাঁদের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করেছে। সেখানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, দুই দেশের টানাপোড়েন-সহ বিভিন্ন বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তাঁর বক্তব্যে দুটি দিক উঠে এসেছে। প্রথমটি হল, ভারতে বসে শেখ হাসিনার একের পর এক বিবৃতি এবং দ্বিতীয়টি হল ভৌগলিক কারণে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা।
ওই সাক্ষাৎকারে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা দাবি করেছেন, ভারতে বসে শেখ হাসিনার যে কোনও ধরনের বিবৃতি প্রত্যাশা করে না বাংলাদেশ। বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন তৎপরতা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের জন্য ভালো কোনও উদাহরণ হবে না বলেও তিনি মনে করেন। আবার তিনিই বলেছেন, কিছু ভুল বোঝাবুঝি বা অস্বস্তি থাকলেও ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে বাংলাদেশ-ভারত সুসম্পর্ক বজায় রাখা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সবচেয়ে বড় যে দাবিটি করেছেন তা হল, হাসিনা সরকারের আমলে ইচ্ছে করে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করা হয়েছিল। তাঁর কথায়, ভারত ও পাকিস্তান একে অপরকে শত্রু মনে করলেও দুই দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় বাংলাদেশ। আবার বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নের ঘটনা নিয়েও তাঁর মত বেশ অবাক করা। তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ভারতের সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে বাংলাদেশ কখনোই কথা বলে না। বাংলাদেশের বিষয়েও ভারত সরকারেরও একই নীতি মেনে চলা উচিত।
বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক মহলের মতে, তৌহিদ হোসেন আসলে তাঁর ভারত-বিরোধিতার সুর বজায় রাখতে চাইছেন। শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলি মুহাম্মদ ইউনূস সরকারকে এই পথেই পরিচালিত করছে। জামাত-সহ বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠন পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক পুনঃস্থাপনের জন্য চাপ দিয়েছে ইউনূস সরকারকে। যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম, তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় বাংলাদেশের পূর্ববর্তী সমস্ত সরকার এবং বাংলাদেশি জনগণের একটা বিপুল অংশ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়নি। কিন্তু একমাত্র ব্যতিক্রম মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তাঁরা ভারত নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরণের সম্পর্ক স্থাপনের জন্য একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে। কিন্তু এটা কি বাংলাদেশের জনগণ ভালো ভাবে মেনে নিচ্ছেন? আসলে ইউনূসের বাংলাদেশে এখন কোনও রকম বাক স্বাধীনতা নেই। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াকেও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কেউ সরকারবিরোধী কথা বললেই তাঁকে সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় জেলে ভরা হচ্ছে। ফলে তৌহিদ হোসেনরা নিজেদের মতামতকেই দেশের জনগণের উপর চাপিয়ে দিয়ে একটা ন্যারেটিভ তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছেন। এই অবস্থায় ভারত, একটা সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। নির্বাচন মিটতেই পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে এগোবে নয়া দিল্লি।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post