দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে চিন থেকেই তাঁদের সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্রসস্ত্র কিনে আসছে। সে আওয়ামী লীগ সরকারে থাকুক বা বিএনপি। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে তদারকি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে তাঁরা সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে এবার তুরস্কের দিকে হাত বাড়িয়েছে। আর তাৎপর্যপূর্ণভাবে সেটা করা হচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে এড়িয়ে। যা নিয়ে তদারকি সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হচ্ছে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশ শিল্প উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিডা চাইছে দেশ যেন সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্রসস্ত্র তৈরিতে আত্মনির্ভর হয়। আর এটা করতে গিয়ে বাংলাদেশের তদারকি সরকার তুরস্কের সঙ্গে কাজ করতে চাইছে। সম্প্রতি বিডা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন পাঁচ দিনের তুরস্ক সফরে গিয়েছিলেন। এরপরই একটি অত্যাধুনিক রাইফেল হাতে তাঁর একটি ছবি সমাজ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেটি ছিল তুরস্কের তৈরি রাইফেল। সূত্রের খবর বিডা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান তুরস্কের মধ্য আনাতোলিয়া অঞ্চলের কিরিক্কালে অবস্থিত সরকারি মালিকানাধীন মাকিনে ভে কিমিয়া এন্ডুস্ট্রিসি বা এমকেই পরিদর্শন করেন। সেখানেই এই ছবি তোলা হয়েছিল। আরও জানা যাচ্ছে, আশিক চৌধুরী তুরস্কের সাথে আরও গভীর কৌশলগত প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গড়ে তোলা, অস্ত্র উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো একাধিক বিষয়ে আলোচনা সেরে এসেছেন। কোনও কোনও সূত্র দাবি করছে, তিনি এই সফরের সময় তার তুর্কি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মৌ চুক্তিও সেরে এসেছেন। তবে প্রশ্ন অন্য জায়গায়, সেটা হল বাংলাদেশের শিল্প উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কি পারে এই ধরণের সিদ্ধান্ত নিতে? বিডা-র কর্মকর্তাদের তুরস্ক সফরে কি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্তারা ছিলেন? কোনও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা ছিলেন? প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর হল “না”। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, তদারকি সরকারের নয়নের মণি, বিদেশী নাগরিক বিডা-র চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী সেনাবাহিনীকে এড়িয়েই তুরস্কর সঙ্গে কথাবার্তা এগিয়ে এসেছেন। জানা যাচ্ছে, বিডা ইতিমধ্যেই তুরস্কের সহযোগিতায় চট্টগ্রাম এবং নারায়ণগঞ্জে প্রতিরক্ষা শিল্প কমপ্লেক্স নির্মাণে জোরালো আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সেই মতো জমি জরিপের কাজও শুরু হয়ে গিয়েছে।
২০১৮ সালে শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। সেবার তুর্কি নির্মাতাদের কাছ থেকে বায়রাক্টর টিবি২ ড্রোন সহ ১৫টি বিভিন্ন ধরণের সামরিক সরঞ্জাম কেনা হয়। যে ড্রোন তাঁরা মাঝেমধ্যেই ভারতীয় সীমান্তে ওড়ায়। এবার বাংলাদেশ চাইছে নিজেদের দেশেই অস্ত্র কারখানা তৈরি করতে। বিডা কর্তৃপক্ষ চাইছে চট্টগ্রাম এবং নারায়ণগঞ্জে “ডেডিকেটেড প্রতিরক্ষা শিল্প ক্লাস্টার” তৈরি করতে। এই এলাকা যেমন সমুদ্র বন্দরের নিকট, তেমনই বিভিন্ন নদীর মোহনা। ফলে ভারী শিল্পের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ। প্রশ্ন হল বাংলাদেশ অস্ত্র তৈরি করে কি করবে? সে দেশের কয়েকটি মহল দাবি করছে, তুরস্ক চাইছে বাংলাদেশেই এমকেই তাঁদের বোরান ১০৫ মিমি হাউইটজার, ওটোকার তুলপার হালকা ট্যাঙ্ক ও অন্যান্য মেশিনগান তৈরি করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে সরবরাহ করুক আর বাকিটা বিদেশে রফতানি করুক। এটা ভবিষ্যতের জন্য ভালো প্রস্তাব হলেও বাংলাদেশের জন্য বিপদ বাড়বে বৈকি কমবে না।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশ মনে করছেন, এই মুহূর্তে ভারতের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক মোটেই ভালো না। ফলে বাংলাদেশ তুর্কির দিকে ঝুঁকলে সেটা মোটেই ভালোভাবে নেবে না নয়া দিল্লি। অন্যদিকে একটি অংশ মনে করছে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাখাইন মানবিক করিডোরের নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যে সামরিক ঘাঁটি দিতে চলেছে, এটা তারই অঙ্গ। তুরস্কের ড্রোন ও অন্যান্য অস্ত্রসস্ত্র আসলে রাখাইন করিডোর দিয়ে আরাকান আর্মির হাতে পৌছে দেওয়া হবে। যা চিন ও মিয়ানমার কোনও মতেই মেনে নেবে না। কারণ, মিয়ানমারের জুন্টা শাসকদের সরাসরি পাশে দাঁড়িয়েছে চিন। মূলত চিনা অস্ত্র নিয়েই আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়ছে জুন্টা বাহিনী। সেখানে যদি বাংলাদেশ হয়ে তুরস্ক ও মার্কিন অস্ত্রশস্ত্র আরাকান আর্মির হাতে পৌঁছয় সেটা বাংলাদেশের জন্য মোটেই ভালো হবে না। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেখানে বিডা দেশে বিগত ৯ মাসে একটাও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আসতে পারেনি, বরং গালভরা প্রতিশ্রুতিই দিয়ে চলেছে। সেখানে সেনাবাহিনীকে এড়িয়ে তুরস্কের মতো দেশের সঙ্গে সামরিক অস্ত্র কারখানা তৈরির চেষ্টা চিন একেবারেই মেনে নেবে না। ফলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। আর আসিক চৌধুরীর মতো বিদেশি নাগরিক আজ আছে কাল থাকবেন না। তখন এই বিপদ সামলাতে হবে বাংলাদেশের জনগণকেই।












Discussion about this post