বাংলাদেশের সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা ছাড়ার ঠিক আগেই এমন কয়েকটি কাজ করে গিয়েছেন যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক পরিমন্ডলে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আবার কেউ কেউ বলছেন, ইউনূসের এই কার্যকলাপ গোটা বিশ্বেই বিরল। আবার ক্ষমতা ছাড়ার আগে মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই নিজেকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করে গিয়েছেন। আবার তাঁর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদায় নেওয়ার মাত্র তিনদিন আগে তড়িঘড়ি এবং অতি গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য শুল্ক চুক্তি করে। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে ১০ ফেব্রুয়ারি একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তাতে বলা হয়েছিল প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব ছাড়ার পর এক বছর পর্যন্ত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স বা এসএসএফ সুবিধা পাবেন। এই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই, বিশেষ নিরাপত্তা আইন ২০২১-এর ১২ নম্বর ধারায় দেওয়া ক্ষমতাবলে গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫-এ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা বিধিমালা ২০২৫-এর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। সে সময়ও বিতর্ক হয়েছিল, যদিও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছিলেন, এসএসএফ সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা কোনও আইন লঙ্ঘন করেননি। তাঁর দাবি ছিল, এটি অস্বাভাবিক বা নজিরবিহীন কোনও বিষয় নয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইউনূসের এই বিজ্ঞপ্তি নিয়ে অন্য মত দিচ্ছেন।
ঘটনা হল, গত ১০ফেব্রুয়ারি মুহাম্মদ ইউনূস নিজেকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করার গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিলেন, তা এখন আর বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় বা বিজি প্রেসের ওয়েবসাইটে নেই। সাধারণত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত সব গেজেট এই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। পুরনো সব গেজেটও এই ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। কিন্তু এই গেজেট নোটিফিকেশনটি আচমকাই গায়েব হয়ে গিয়েছে। বিজি প্রেস সূত্রে জানা যাচ্ছে, এ বিষয়ে সরকারি নির্দেশ অনুসরণ করেই তাঁরা গেজেট বিজ্ঞপ্তিটি সরিয়ে দিয়েছেন। আর এটা যদি সত্যি হয় তাহলে বিএনপি সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকেই নির্দেশ এসেছিল ধরে নিতে হবে। অপরদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুহাম্মদ ইউনূস প্রবলভাবে চাইছেন তাঁকে রাষ্ট্রপতি করা হোক। এর জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাও চালাচ্ছেন বলেই দাবি ওই বিশ্লেষকদের। প্রশ্ন হল তারেক রহমানের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি কি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মুহাম্মদ ইউনূসকে মনোনীত করবে? যা নিয়ে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট জলঘোলা হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি এই আলোচনা বৈধতা পাচ্ছে। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন খলিলুর রহমান। তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করা হয়েছিল। তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই খলিলুর রহমানকেই তারেক রহমান তাঁর মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছেন। তাও আবার বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে বিতর্কিত ওই উপদেষ্টাকে। অনেকের মতে, এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রশাসনের সংযোগ এবং ধারাবাহিকতা প্রকাশ করে। আর সেই সূত্র ধরেই যদি তারেকের সরকার ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি পদে বসিয়ে দেয়, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
তারেক রহমানের মন্ত্রী পরিষদের তালিকায় না থাকা বিএনপির প্রবীণ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম রাষ্ট্রপতি হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। আবার বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ভোটের পর একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়ার পূত্র তারেক রহমান এবং বিএনপির শীর্ষনেতাদের যে সুখ্যাতি করেছেন তার ফলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর থেকে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়ে যাচ্ছে। এতকিছুর পরও মুহাম্মদ ইউনূসকেও বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে একজন বিরল বিকল্প হিসেবে মানুষ উড়িয়ে দিচ্ছে না। তাঁদের মতে, পশ্চিমা দেশগুলির সঙ্গে মুহাম্মদ ইউনূসের যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং তা তিনি কাজে লাগতেও পারেন। সেই দিক থেকে ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি পদে বসিয়ে দিলে তারেক এর সুবিধা নিতে পারবেন। যদিও বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। কিন্তু তিনি যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে তাঁকে সরাতে হলে সংসদে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনতে হবে। এটা কি তারেক রহমান করবেন? নাকি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সঙ্গে বসে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের রাস্তায় যাবেন। কিন্তু পরিস্থিতি যে দিকে এগোচ্ছে তাতে গোটা বিষয়টা এখনও রহস্যে ঢাকা। কারণ, তারেকের মন্ত্রিসভায় মার্কিন প্রভাব রয়েছে। আবার তারেক এবং বিএনপির বহু শীর্ষ নেতাই ব্যক্তিগতস্তরে মুহাম্মদ ইউনূসকে পছন্দ করেন না। তাই ইউনূস রাষ্ট্রপতি হবেন নাকি, তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে বিচারের কাঠগড়ায় উঠবেন, সেটা ভবিষ্যতই বলবে।












Discussion about this post