গত বিধানসভা ভোটের আগে তৃণমূল কংগ্রেস গোটা রাজ্যেই মাইক ফুঁকে প্রচার করেছিল, বিজেপি বাঙালি বিরোধী। রাজ্যের শাসকদলের এ হেন প্রচারের পাল্টা কোনও তত্ব খুঁজে বের করতে পারেনি বঙ্গ বিজেপি। ফলে তাঁদের রাজ্য দখলের আকাঙ্খাই সংকটে পড়ে যায়। এবারও তৃণমূল যে একই অস্ত্রে শান দেবে, সেটা স্পষ্ট। তাই রাজ্য সভাপতির চেয়ারে বসে শমীক বাঙালিয়ানার উপরেই জোর দিয়েছেন। এবার কি খেলা হবে?
বৃহস্পতিবার সায়েন্স সিটিতে বঙ্গ বিজেপির নয়া সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সংবর্ধনা–মঞ্চে দেখা গিয়েছিল মা কালীর ছবি। আচমকা রামের বদলে কালী কেন, তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছিল। রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসও রাজনৈতিক মঞ্চে মা কালীর ছবি ব্যবহার করা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। কারণ, সংবর্ধনা মঞ্চের ডিজিটাল স্ক্রিনে কালীর পাশে দেখা গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ছবিও। বাংলার নারী ও শিশুকল্যাণমন্ত্রী শশী পাঁজা বলেন, ‘বিজেপির মঞ্চে মা কালীর ছবি! মায়ের পাশে আবার প্রধানমন্ত্রীর ছবি! এটা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। আমাদের ভাবাবেগে আঘাত লেগেছে।
এতদিন আমরা দেখে এসেছি, বিজেপির যে কোনও কর্মসূচিতে রামের ছবি ব্যবহার করতে। এমনকি জয় শ্রীরাম ধ্বনিও যেন বিজেপির রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়েছিল এই বঙ্গে। যা নিয়ে রাজ্যের শাসকদল বিজেপিকে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রচার ভিত্তিক দল বলে দেগে দিয়েছে অনায়াসে। এবার কি তবে ছবিটা পাল্টাবে। সদ্যই বঙ্গ বিজেপির সভাপতি বদল হয়েছে। ডঃ সুকান্ত মজুমদারের বদলে নতুন রাজ্য সভাপতি হলেন পুরোনো আরএসএস কর্মী তথা দীর্ঘদিনের বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্য। তিনি সভাপতি হয়েই তাঁর প্রথম ভাষণে বেশ কয়েকটি গুগলি দিয়েছেন। যেমন, সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্যে তিনি নতুন বার্তা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, এবার থেকে বিজেপি শুধু হিন্দূত্বের প্রচার করবে না, প্রয়োজনে মুসলিম প্রীতিও দেখাবে। তাঁর বক্তব্য ছিল মুসলিমদের কেবলমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে তৃণমূল। কিন্তু বিজেপি চায় মুসলিমদের হাত থেকে বোমা সরিয়ে কলম ধরাতে।
এবার বিজেপি বাঙালির সামনে আরেকটি বড় চমক নিয়ে হাজির হচ্ছে। ছাব্বিশের নির্বাচনে যে বাংলা অন্য এক বিজেপিকে দেখবে, সেটা এখন থেকেই বোঝা যাচ্ছে। শমীকের সংবর্ধনা–মঞ্চে রামের বদলে মা কালীর ছবিতেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, হিন্দুত্বের কথা বললেও তা এ বার থেকে বাঙালিয়ানার মোড়কেই কথা বলবে বিজেপি। পাশাপাশি বিজেপি কতটা বাঙালি দরদি, সেটা বোঝাতে আবার সর্বভারতীয় নেতা অমিত মালব্য তাঁর এক্স হ্যান্ডলে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের দল। বিজেপি-র জন্মই বাংলায় হয়েছে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলির শিকড়ের সঙ্গে বাংলার কোনও যোগসূত্র নেই। তাই তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলার কোনও মিল নেই। শুধু বিজেপির সঙ্গেই বাঙালির সংস্কৃতির যোগ আছে। এখানেই শেষ নয়, তিনি আরও লিখেছেন, আমাদের লড়াইটা শুধুমাত্র রাজনৈতিক লড়াই নয়, পশ্চিমবঙ্গের আত্মাকে বাঁচানোর লড়াই। মা কালী, মা দুর্গা, দেবী চণ্ডীই বাংলার পরিচয়।
রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, গত বিধানসভা নির্বাচন থেকেই তৃণমূল কার্যত বিজেপিকে বহিরাগতদের দল বলে প্রচার করে যাচ্ছে। একুশের বিধানসভা হোক বা চব্বিশের লোকসভা নির্বাচন, ঘনঘন দিল্লির বিজেপি নেতারা এই বঙ্গে আসা-যাওয়া করেছিলেন। নরেন্দ্র মোদি থেকে অমিত শাহ, যোগী আদিত্যনাথ থেকে শুরু করে হিমন্ত বিশ্বশর্মা। ফলে তৃণমূলের বহিরাগত তত্ত্ব এতেই মান্যতা পেয়ে গিয়েছিল। এবার সেই ধারা পাল্টাতে বধ্যপরিকর বঙ্গ বিজেপি। তাই মঞ্চে ভগবান রামের বদলে মা কালীর ছবি দেখা যাচ্ছে। হিন্দুত্বের পাশাপাশি মুসলিমদেরও পাশে থাকার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। আর এই কৌশল বুঝেই বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টায় তৃণমূল কংগ্রেস। তাহলে কি পায়ের তলার মাটি কাঁপছে?












Discussion about this post