চাকরিহারা শিক্ষাকর্মীদের জন্য মাসিক ভাতা ঘোষণা। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করার নীতি নিলেন? দেশের সর্বোচ্চ আদালত যেখানে দুর্নীতি হয়েছে বলে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষা কর্মীদের চাকরি বাতিল করেছে। যোগ্য অযোগ্য আলাদা করতে না পেরে, সেখানে এই শিক্ষা কর্মীদের ভাতা দেওয়া কতটা আইনসম্মত সেই প্রশ্ন উঠছেই।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি চাকরিহারা শিক্ষা কর্মীদের জন্য বিশেষ ভাতা ঘোষণা করেছেন। ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরি পাওয়া গ্রুপ ‘সি’ কর্মীদের মাসিক ২৫ হাজার এবং গ্রু ‘ডি’ ২০ হাজার টাকা করে দেবে রাজ্য সরকার। এ বিষয়ে নবান্ন থেকে জানানো হয়েছে, মামলার নিষ্পত্তি যত দিন না হচ্ছে, তত দিন চাকরিহারা শিক্ষাকর্মীদের এই ভাতা দেবে রাজ্য সরকার। কিন্তু এর মধ্যেই প্রশ্ন ওঠা শুরু হয়ে গিয়েছে, এইরকম সিদ্ধান্ত কতটা আইনসম্মত ও যুক্তিগ্রাহ্য। এতে কি আদালত অবমাননা হবে না? হলে আরো একবার রাজ্য সরকার মামলার জটে আটকে পড়তে পারে বলেই মনে করছেন আইনজীবীদের একাংশ। সেইসঙ্গে রাজ্য সরকার যে রিভিউ পিটিশন দাখিল করতে চলেছে তাতেও এই সিদ্ধান্ত একটা বড় অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে বলেও মত আইনজীবীদের। ২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর নিয়োগ হয়েছিল। সেই নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগে গোটা প্যানেলই বাতিল করেছে সুপ্রিম কোর্ট। এতে যেমন শিক্ষক-শিক্ষিকারা রয়েছেন, তেমনই শিক্ষাকর্মীরাও রয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট এসএসসি পুরো প্যানেল বাতিল করার কারণে শিক্ষাকর্মীদের বেতন বন্ধ হচ্ছে এপ্রিল মাস থেকেই। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত যোগ্য শিক্ষক শিক্ষিকারা স্কুলে যেতে পারবেন এবং বেতন পাবেন। ততদিনে তাঁদের নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে নিজেদের যোগ্যতার প্রমান দিতে হবে। কিন্তু এই রায় শিক্ষাকর্মীদের জন্য ছিল না, অর্থাৎ তাঁরা এখন থেকেই স্কুলে যোগ দিতে পারবেন না। এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল, গ্ৰুপ সি ও গ্ৰুপ ডি প্যানেলে এতটাই জল ঘোলা যে যোগ্য ও অযোগ্য একেবারেই আলাদা করা অসম্ভব। তাই তাঁদের প্যানেল বাতিলই থাকবে। এবার মুখ্যমন্ত্রী সেই শিক্ষা কর্মীদের জন্য ভাতা ঘোষণা করে দিলেন। রাজ্য সরকারের পরিভাষায় ‘সোশ্যাল সিকিউরিটি স্কিম’-এর মাধ্যমে ‘এক্সগ্রাসিয়া’ অর্থাৎ সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় এই ভাতা দেওয়া হবে। কিন্তু যেখানে দুর্নীতির প্রশ্ন উঠছে, আদালতে দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে এবং সেই দুর্নীতির ব্যাপকতা এতটাই বেশি যে যোগ্য ও অযোগ্য আলাদা করা গেল না, সেখানে কিভাবে সামাজিক সুরক্ষা আসছে? তাহলে কি নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে, দুর্নীতি ঢাকতেই জনগণের করের টাকা এভাবে খরচ করছে রাজ্য সরকার?
আইনজীবীদের একাংশ দাবি করছেন, রাজ্য সরকারি এই সিদ্ধান্ত খুব শীঘ্রই আদালতের আতসকাঁচের নিচে আসবে। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন ধরণের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প এটা? রাজ্যের শিক্ষমন্ত্রী একদিকে বলছেন, আমরা কোর্টের রায় মেনে কাজ করব। অন্যদিকে আবার এই ধরণের ভাতা দিয়ে সেই রায়কেই কার্যত অস্বীকার করা।
মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধীরা। আইনজীবী ফিরদৌস শামিম দাবি করেছেন, ‘উনি এ ভাবে অযোগ্যদের বেতন পাইয়ে দিতে পারেন না। এটা কলকাতা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে রায়ের বিরোধী। উনি আদালত অবমাননা করছেন।
চাকরিহারা অশিক্ষক কর্মীদের জন্য রাজ্য সরকারের এই ভাতা দেওয়ার প্রকল্প যে খুব শীঘ্রই আদালতের নজরে আনা হবে এটা পরিষ্কার। যদিও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই বহুবার দাবি করেছেন কেউ কেউ চাকরি দিতে পারে না, কিন্তু চাকরি খেতে পারে! আমি কিছু করলেই আদালতে গিয়ে পিল করে। কিন্তু বিরোধিদের প্রশ্ন, যে তাঁর দলের নেতারা ঘুষ নিয়ে চাকরি বিক্রি করেছে, কেন্দ্রীয় এজেসির তদন্তে তা উঠেও এসেছে। রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী এখনও জেলে রয়েছে। তবুও বেআইনি সিদ্ধান্ত নিতে ছাড়ছেন না মুখ্যমন্ত্রী। এর থেকেই প্রমান হয়, তিনি টাকা দিয়ে চাকরিহারাদের মুখ বন্ধ করতে চাইছেন। যদিও তিনি জানেন, এটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়।












Discussion about this post