দুর্গাপুজোর রমরমা পশ্চিমবঙ্গের বাইরে খুব একটা নেই। যদিও ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালিরা মহা ধুমধামে দূর্গা পূজার আয়োজন করেন। আবার কয়েকটি বিখ্যাত দূর্গা মন্দির রয়েছে ভারতবর্ষের কয়েকটি রাজ্যে। এর মধ্যে একটি দূর্গা মন্দির খুবই রহস্যময়। এখানে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন নাসার বিজ্ঞানীরাও।
সমুদ্রস্পৃষ্ঠ থেকে ৮,৬০০ ফুট উচ্চতায় পাইন ও দেবদারু গাছে ঘেরা এক রহস্যময় মন্দির। যাকে ঘিরে অনেক লোকগাঁথা ও অলৌকিক ঘটনা। এই রহস্যময় মন্দিরটি হল উত্তরাখণ্ড রাজ্যের আলমোড়ার কাছে কাসারগড়ের দুর্গামন্দির। কুমায়ুন পাহাড়ের অতি জাগ্রত দেবী কাসার দুর্গা। মন্দিরটি নতুন হলেও মূল গর্ভগৃহ একটি প্রাচীন গুহা। যেখানে রয়েছে অতি প্রাচীন এক অষ্টভুজা সিংহবাহিনী দেবী দুর্গার মূর্তি। আর পাশেই জ্বলছে ‘অখণ্ড জ্যোতি’। যা কখনও নেভে না। কাসার দেবীর মন্দিরেই আছে এক পবিত্র হোমকুণ্ড, যা প্রতিনিয়ত জ্বালিয়ে রাখা হয়। এই যজ্ঞস্থানের ছাই গায়ে মাখলেই নাকি সেরে যায় যে কোনও মানসিক রোগ। ফলে দূর দুরন্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন মা দুর্গার চরণে পুজো দিতে। কিন্তু এই মন্দিরটি আরও এক কারণে বিখ্যাত।
কুমায়ুন পাহাড়ের কাসার দেবীকে বিশ্বের দরবারে প্রথম চিনিয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। ১৮৯০ সালে তিনি এসেছিলেন কাসার দেবী মন্দিরে। কাসার দেবীর মায়াবী পরিবেশ স্বামীজিকে দিয়েছিল গভীর প্রশান্তি। তাই দীর্ঘদিন তিনি এই মন্দিরের পাশেই এক গুহায় ধ্যান করেছিলেন। ওই গুহাটি আজও আছে। গোটা এলাকাজুড়ে আজও এক মায়াবী পরিবেশ ছড়িয়ে রয়েছে। সবসময়েই মনে একটা প্রফুল্লতা বিরাজ করে এই এলাকায়। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিজ্ঞানীরা এখানে ছুটে এসেছিলেন। দেশ বিদেশের বহু বিজ্ঞানী আজও এই মন্দিরের আশেপাশে গবেষণা চালান। কারণ কি জানেন? এই মন্দির ঘিরে রয়েছে আশ্চর্য এক শক্তিশালী চৌম্বকীয় বলয়।
সেই ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী উইলিয়াম গিলবার্ট দাবি করেছিলেন পৃথিবীকে ঘিরে আছে এক শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র। পরবর্তী সময় ১৯৫৮ সালে মহাকাশ বিজ্ঞানী জেমস ভ্যান, আবিষ্কার করেছিলেন পৃথিবীকে ঘিরে থাকা দুটি অতি উচ্চ ক্ষমতাশালী তেজস্ক্রিয় বলয়। যেগুলির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ভ্যান অ্যালেন বেল্ট’। এই বলয় দুটি সৌর ঝড়কে আটকে দিয়ে পৃথিবীর আবহাওয়ামণ্ডলকে রক্ষা করে। অনেক পরে নাসা এই ভ্যান অ্যালেন বেল্ট নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে জানতে পারেন শক্তিশালী ভ্যান অ্যালেন বেল্ট অবিশ্বাস্য প্রভাব ফেলেছে পৃথিবীর মাত্র তিনটি স্থানের ওপর। একটি পেরুর বিখ্যাত মাচু পিচ্চু অঞ্চলে, দ্বিতীয়টি ইংল্যান্ডের প্রাগৈতিহাসিক মনুমেন্ট স্টোনহেঞ্জ এবং তৃতীয়টি হল ভারতের উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুন অঞ্চলে থাকা একটি গিরিশিরা। অর্থাৎ খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে নির্মিত এই কাঁসার দেবী মন্দির যেখানে অবস্থিত। এই পাহাড়ের বিভিন্ন গ্রাম ও আশেপাশের বাসিন্দারা বিশ্বাস করেন, মা কাঁসার বা দূর্গা প্রতি কার্তিক পুর্ণিমায় গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। তাঁর পায়ের নুপুরের ধ্বনি শোনা যায়। স্বামী বিবেকানন্দ এখানে আসার পরবর্তীকালে এই মন্দিরে এসেছিলেন বিশ্বের নানা দেশের শিক্ষাবিদ, মনস্তাত্ত্বিক, রহস্যপ্রেমী, গবেষক, দার্শনিকগণ। এখানে সর্বদা এক অপার শান্তি বিরাজ করে। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবিশঙ্কর, উদয়শঙ্কর, বব ডিলনের মতো মনীষীরা এই মন্দিরে ছুটে এসেছেন। আজও প্রাচীন এই দূর্গা মন্দির এক রহস্যর মোড়কে দাঁড়িয়ে রয়েছে কুমায়ুন পাহাড়ের কোলে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানসিক রোগীকে নিয়ে তাঁদের আত্মীয়রা আসেন এখানে। মন্দিরের পবিত্র হোমকুণ্ড থেকে ছাই মাখিয়ে দেন তাঁদের গায়ে। বিশ্বাস মানসিক রোগ বা পাগলামি সেরে যায় তাতে। হাওড়া থেকে ট্রেনে কাঠগোদাম বা লালকুঁয়া স্টেশনে পৌঁছে গাড়িতে পৌঁছে যাওয়া যায় আলমোড়া। সেখানেই রয়েছে বিখ্যাত কাঁসার দেবী বা দূর্গা মন্দির।












Discussion about this post