ভারতীয় রেলে এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায় বন্দে ভারত এক্সপ্রেস। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনকালে চালু হওয়া এই সেমি হাইস্পিড ইঞ্জিনবিহীন ট্রেন নিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের গর্বের অন্ত নেই। কিন্তু কোথাও বন্দে ভারতের ভিতর জল পড়ছে, তো কোথাও চলন্ত ট্রেনেই চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যু হচ্ছে যাত্রীর। হেলদোল নেই রেলের। উঠছে প্রশ্ন।
শুক্রবার জম্মু ও কাশ্মীরের মধ্যে প্রথম ট্রেন চলাচল শুরু করল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে জম্মুর শ্রী মাতা বৈষ্ণ্যদেবী কাটরা স্টেশন থেকে একটি নয়, দুটি বন্দে ভারতের উদ্বোধন হল, যা প্রথমবার কাশ্মীরের শ্রীনগরের উদ্দেশ্যে রওনা হল। স্বাধীনতার পর এই প্রথমবার দেশের মূল ভূখন্ড থেকে কাশ্মীর উপত্যকায় ট্রেন গেল। শনিবার থেকে দুটি বন্দে ভারত এক্সপ্রেস জম্মুর শ্রী মাতা বৈষ্ণ্যদেবী কাটরা স্টেশন থেকে কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর পর্যন্ত নিয়মিত যাত্রী নিয়ে চলাচল করবে। বোঝাই যাচ্ছে, বন্দে ভারত ট্রেন ভারতীয় রেলের জন্য কতটা গর্বের। কিন্তু এই গর্বের ট্রেনেও মাঝে মধ্যে এমন ঘটনা ঘটে, যা রেলের গর্ব খর্ব করার পক্ষে যথেষ্ট। যেমন গত বুধবারই পুরী থেকে হাওড়াগামী বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক ঘটনা। চলন্ত ট্রেনের মধ্যেই ছটফট করতে করতে প্রাণ হারালেন ঢাকুরিয়ার বাসিন্দা হিমাদ্রি ভৌমিক। ওড়িশার কটক শহরের কাছে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে জানা যায়। পুরী-হাওড়া বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের সি–2 কামরায় ছিলেন তিনি। সহযাত্রীদের দাবি, শারীরিক যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকেন ওই প্রৌঢ়। টিকিট পরীক্ষককে খবর দিলে তিনি আশ্বস্ত করেন, ভুবনেশ্বর স্টেশনে চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু যাত্রীদের দাবি, ভুবনেশ্বরে ট্রেন পৌঁছলেও বাস্তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনও চিকিৎসক তো দূর, কোনও রকম মেডিকেল এমার্জেন্সির ব্যবস্থাই করেনি রেল কর্তৃপক্ষ। উল্টে ট্রেনে ওঠার তাড়া দিতে থাকে আরপিএফ। এরপর যাত্রীদের চাপ ও বিক্ষোভে প্রায় ৪৫ মিনিট পর একটি ব্যাটারিচালিত গাড়ি আনা হয় ওই প্রৌড়ের জন্য। কিন্তু যাত্রীদের দাবি, ততক্ষণে সব শেষ। সহযাত্রীদের প্রশ্ন, বন্দে ভারতের মতো প্রিমিয়াম ট্রেনে কেন এই অব্যবস্থা। ভূবণেশ্বর স্টেশনে কেন আগেভাগে মেডিকেল টিম থাকবে না? দোষ কার?
যদিও ওই ঘটনা সামনে আসতেই জানা গেল, তার আগের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবারই উল্টো চিত্রের সাক্ষী থেকেছেন নিউ জলপাইগুড়ি-হাওড়া বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের যাত্রীরা। নিউ জলপাইগুড়ি-হাওড়া বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের এক যাত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু ট্রেনের ভিতর থাকা পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে ঘোষণা করায় ওই অসুস্থ যাত্রীর সহায়তায় এগিয়ে এসেছিলেন এক চিকিৎসক। তাঁর চিকিৎসায় অনেকটাই সুস্থ বোধ করেন ওই যাত্রী। নিউ জলপাইগুড়ি-হাওড়া বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে কলকাতায় ফিরছিলেন আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক ঐশ্বর্য রায়। তিনি ছিলেন সি-৯ কামরায়। আর পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে ঘোষণা হয় সি-৮ কামরায় এক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই দ্রুতই তিনি তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন।
রেলের আধিকারিকদের বক্তব্য, টিকিট সংরক্ষণ স্লিপে একটি কলাম থাকে। তাতে কোনও ব্যক্তি চিকিৎসক বা ডাক্তারি পরিষেবা প্রদানের সঙ্গে যুক্ত হলে ওই স্লিপে তা উল্লেখ করতে বলা হয়। যাতে সংশ্লিষ্ট ট্রেনে কোনও যাত্রীর অসুস্থ হয়ে পড়লে সেই ব্যক্তির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া যায়। আবার ট্রেনে কোনও চিকিৎসক যদি না থাকেন। আর যদি কোনও যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন, তা হলে পরবর্তী স্টেশনে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করে ট্রেনের ভিতর থাকা রেলকর্মীরা। এ ক্ষেত্রে পুরী-হাওড়া বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের দায়িত্বে থাকা রেল কর্মীদের গাফিলতি ছিল এটাই প্রমানিত হচ্ছে। কারণ, সহযাত্রীদের বারবার অনুরোধ সত্বেও ওই ট্রেনের টিকিট পরীক্ষক, ট্রেন ম্যানেজার কেন ভূবণেশ্বর স্টেশনে জানান নি সেটাই খতিয়ে দেখছে রেল। প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। মেল এক্সপ্রেসে নিয়মিত যাত্রীদের দাবি, বন্দে ভারত এক্সপ্রেসকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। অন্যান্য মেল-এক্সপ্রেস ট্রেনকে দীর্ঘক্ষণ কোনও স্টেশনে দাঁড় করিয়ে রেখে বন্দে ভারত ট্রেনকে আগে পাস করানো হয়। এ ক্ষেত্রে কোনও কারণে বন্দে ভারতের পরিষেবা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে, তবে বন্দে ভারত ট্রেনকে দোষারোপ করে লাভ নেই।












Discussion about this post