বাংলাদেশের সংবিধানকে সংশোধনের নামে এ পর্যন্ত মোট ১৭ বার কাটাছেড়া করা হয়েছে। এরমধ্যে শেখ মুজিবর রহমান ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার মোট ৭ বার। জিয়াউর রহমান, আব্দুস সাদ্দার ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ৬ বার এবং জেনারেল এরশাদের নেতৃত্বধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি মোট ৪ বার বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন করেছে। মজার বিষয় হল, প্রতিবারই ক্ষমতায়সীন দল নিজেদের মতো করে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে সংবিধান পরিবর্তন করেছে। এটা নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে পদ্মাপাড়ে। যদিও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বাংলাদেশের সংবিধাননে মৌলিক বিষয়গুলিতে যে বারবার পরিবর্তন করা হয়েছে তা অনাকাঙ্খিত। বর্তমানে বাংলাদেশে এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। গত জুন জুলাইয়ের এক গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে পতন হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকারের। মূলত বৈষম্য বিরোধী ছাত্র নেতাদের এবং আরো কয়েকটি সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বে এই গণআন্দোলনের পরিণতি তৃতীয়বার স্বাধীন বাংলাদেশ। এই তদারকি সরকার বৈষম্য বিরোধী ছাত্র নেতাদের উদ্যোগেই গঠিত, যার নেতৃত্বে মুহাম্মদ ইউনুস। এবার এই তদারকি সরকার চায় বাংলাদেশের সংবিধানের খোল নলচে বদলে ফেলতে। ইতিমধ্যেই তোদের কি সরকার সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করেছে এবং তারা একটি খসড়া রিপোর্ট জমা দিয়েছে। এই সংবিধান সংশোধনী খসড়াতে নতুন করে বেশ কয়েকটি পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকালে একবার সংবিধান সংশোধন করে, সব রাজনৈতিক দলের বহুদলীয় ব্যবস্থা থেকে সরে এসে আনা হয়েছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা। আবার জিয়াউর রহমানের শাসনকালে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে বাদ গিয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। একইভাবে জেনারেল এরশাদের আমলে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা পুরোপুরি বাদ গিয়ে ইসলামী দেশে পরিণত হয়েছিল। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়ে হলো বর্তমান তদানীকে সরকারের নতুন খসড়া রিপোর্টেও এই একই ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অথবা তার কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ হিসাবে তুলে ধরতে যতটা সচেষ্ট ছিলেন, বাকি রাজনৈতিক দল বা সেনা শাসকরা বাংলাদেশকে ইসলামিক দেশে পরিণত করতে বদ্ধপরিকর।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তোদের কি সরকার যে ধরনের সংবিধান সংশোধন করতে চাইছেন। বা নতুন সংবিধান সংস্কার কমিটি যে ধরনের প্রস্তাব জমা দিয়েছে তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার, বাংলাদেশে এই সংস্কার কার্যকর হলে একটা বিপুল পরিবর্তন আসবে। বদলে যাবে বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা, অনেকটাই ক্ষমতা কমবে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর। এমনকি সাংসদদের কার্যকালের মেয়াদও ফের ফের হবে। বিশেষ করে বর্তমানে থাকা এক কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ উঠে গিয়ে ভারতের মতো দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ দেখা যাবে বাংলাদেশে।
উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালে প্রথমবার বাংলাদেশে সংবিধান প্রণয়নের পর শেখ মুজিবর রহমানের আমলেই তিনবার সংশোধন করা হয়েছিল। সেগুলি হল, ১৯৭২ সালেই সংশোধনের মাধ্যমে যুদ্ধপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছিল। এরপর ১৯৭৩ সালে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান আনা হয় এবং ১৯৭৪ সালে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন ও ছিটমহল বিনিময় চুক্তি প্রস্তাব রাখা হয়। ১৯৭৪ সালে, বাংলাদেশে ভয়াবহ দুভিক্ষ এসেছিল, সেই সঙ্গে লাগামছাড়া দুর্নীতি। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে শেখ মুজিবর রহমান সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে আসেন। এবং সেটাই তাঁর হত্যা ডেকে আনে বলে মনে করে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা। সে সময় শেখ মুজিব বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্রদের নিয়ে আওয়ামী লীগ গঠন করেন। নিজে সেই দলের চেয়ারম্যান হন। চতুর্থ সংশোধনীতে তিনি বাংলাদেশে বহুদলীয় ব্যবস্থা তুলে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা চালু করেন। এবং নিজেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব-সহ তাঁর গোটা পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
এবার ফের একবার বাংলাদেশের সংবিধান পরিবর্তনের হিড়িক উঠেছে। কিন্তু সেই সঙ্গে এই প্রশ্নও উঠছে, নির্বাচিত সরকার ছাড়া কীভাবে একটা তদারকি সরকার এটা করতে পারে? যা নিয়ে বহু তর্ক বিতর্ক চলছে। কিন্তু এটাও দেখার, আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে মুহাম্মদ ইউনূস কীভাবে নির্বাচনকে সাইডলাইনে রেখে এই সব সংস্কার করবেন।











Discussion about this post