পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত ৩২ নম্বর বাড়িটি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরও ক্ষান্ত হয়নি উন্মত্ত জনতা। বরং বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে একে একে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীর বাড়ি ভাঙা বা আগুন লাগানোর কর্মযজ্ঞ চলছে। এমনকি বাদ পড়ছে না সাবেক রাষ্ট্রপতির বাড়িও। এরকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। ভারত-সহ বহ দেশ থেকে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে বিবৃতি এসেছে। তাতেই চাপে পড়েছে মুহাম্মদ ইউনুসের তদারকি সরকার। বিকায়দায় পড়ে ঘটনার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই নতুন করে বিবৃতি জারি করতে হল মুহাম্মদ ইউনুসকে।
বাংলাদেশে দিকে দিকে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপ করা হবে। এই ধরনের অশান্তি বরদাস্ত করা হবে না। এমনই কড়া বিবৃতি জারি করা হল বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ফেসবুক পেজ থেকে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই পোস্টটি করা হয়েছে রাত দুটো নাগাদ। তার আগে প্রায় একই রকমের বক্তব্য জানিয়েছিলেন তদারকি সরকারের “গুরুত্বপূর্ণ দফতরবিহীন” উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। তিনি পরপর দুটি ফেসবুক পোস্ট করে বলতে চেয়েছেন এই ভাঙচুরের ঘটনা থেকে বেরিয়ে এসে উচিত হবে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দিকে মনোনিবেশ করা। এতে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট হচ্ছে বলেও খেদ প্রকাশ করেন মাহফুজ। তাঁর দুটি বক্তব্য এবং প্রধান উপদেষ্টার বিবৃতি থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার, গোটা বিষয় থেকে দায় এড়াতে চাইছে তদারকি সরকার।
কিন্তু বাস্তব চিত্র হল, হাসনাত আব্দুল্লাহর মতো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা যখন বুধবার দুপুর থেকেই একে একে ধানমন্ডি ৩২ কর্মসূচির ডাক দিচ্ছিলেন তখন মুখে কুলুপ এঁটে বসেছিলেন ইউনূস বা অন্যান্য উপদেষ্টারা। আবার প্রশ্ন উঠছে, বুধবার সন্ধ্যা থেকে যখন হাজার হাজার উন্মত্ত ছাত্র জনতার ভিড় আছড়ে পড়েছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে, তখন কেন হাত গুটিয়ে বসেছিল পুলিশ? কার নির্দেশে সেনাবাহিনীর জওয়ানরা ঘটনাস্থলে গিয়েও ফিরে গেল কিছু না করেই? যেখানে রাতভর তান্ডব চলল, এমনকি সরকারি বুলডজার আনিয়ে ভাঙা হল সরকারি সম্পত্তি। প্রথমে সবটাই বসে বসে উপভোগ করছিলেন তদারকি সরকারের উপদেষ্টারা। উল্টে বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন দাবি করেন ধানমন্ডির ধ্বংসলীলার জন্য শেখ হাসিনার প্ররোচনামূলক বক্তৃতা দায়ী। এমনকি তাঁর মুখ বন্ধ করতে ভারতকে সরকারিভাবে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ, সেটাও জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।
কিন্তু বৃহস্পতিবার বেলা থেকে যখন দেশ-বিদেশ থেকে প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করে। তখনই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বৃহস্পতিবার রাতেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভেঙে ফেলার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ভারত। বিদেশমন্ত্রক থেকে জারি করা ওই বিবৃতিতে বলা হয়, ভারত মনে করে, শেখ মুজিবের বাড়িটিকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে বলেছে ওই বাড়িটি ছিল বাংলাদেশে দখলদারি এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের সাহসী প্রতিরোধের একটি প্রতীক, যা বুধবার ধ্বংস করা হয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যে সকল ব্যক্তি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলা পরিচয় এবং গৌরবের ভিত্তিকে মূল্য দেন, তারা সকলেই জানেন যে এই বাসভবন বাংলাদেশের জাতীয় চেতনার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এই ভাঙচুরের কর্মকাণ্ডকে দৃঢ়ভাবে নিন্দা করা উচিত।
ভারতের প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট, ভারত ধানমন্ডির ঐতিহাসিক বাড়ি ভাঙার ঘটনার যেমন নিন্দা করেছে, তেমনই ইউনূসের সরকারের নিষ্প্রহতা নিয়েও খোঁচা দেওয়া হয়েছে। এর পর থেকে বহু বিদেশি রাষ্ট্র এই ঘটনার নিন্দা প্রকাশ করে। ফলত চাপে পড়ে যান ইউনূস। তড়িঘড়ি ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামেন প্রধান উপদেষ্টা। গভীর রাতে তাঁর তরফ থেকে আরেকটা বিবৃতি আসে। তাতে বলা হয়, “অন্তর্বর্তী সরকার গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে, কতিপয় ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো এবং অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করছে। এই ধরনের কর্মকাণ্ড সরকার শক্ত হাতে প্রতিহত করবে”। যদিও তার আগের বিবৃতিতে গোটা ঘটনার জন্য শেখ হাসিনার প্ররোচনাকেই দায়ী করা হয়েছিল। কিন্তু ২৪ ঘন্টার মধ্যেই ভোল বদলে যায়। আসলে, ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িই নয়, পরপর ভাঙা হয়েছে বা আগুন দেওয়া হয়েছে একাধিক বাড়িতে। যেমন, শেখ হাসিনার বাড়ি সুধা সদন। আবার রেহাই পাননি তাঁদের অত্মীয়, আওয়ামী লীগের বহু নেতা। তাঁদের বাড়িতেও হামলা হয়েছে, ভাঙচুর চালানো হয়েছে। রাজশাহী, খুলনা, ঢাকায় একাধিক বাড়িতে আগুন ধরানো হয়। যা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতিকেই ইঙ্গিত করে। বিশ্বমঞ্চে সমালোচিত হয়ে মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর ঘনিষ্ট উপদেষ্টা মাহফুজ আলম উল্টো গান গাইতে শুরু করেছেন।












Discussion about this post