বাংলাদেশে এখন নানামুখী আলোচনা চলছে। গত বছর ৫ আগষ্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ এখনও খুঁজে চলেছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। জুন জুলাইয়ের বিপ্লবে যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল, তাঁরাই এখন নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছে। জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্খা বাস্তবায়িত করতে জাতীয় নাগরিক পার্টি নামের সেই রাজনৈতিক দল এখন নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল অন্য দাবি করছে। অনেকেই মনে করছেন এই নতুন রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগেই মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। এই ভাবনার পিছনে অবশ্য যুক্তি আছে। জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক আঙ্গিনায় অবতরণ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি এই মুহূর্তে মূলত আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে তৎপর। একইসঙ্গে তারা বাংলাদেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে সাইড লাইনে ফেলতেও ব্যস্ত। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে রাজনৈতিক দল এখনও নিজেদের সংগঠন গুছিয়ে উঠতে পারেনি তারা দেশের দুই বৃহত্তম রাজনৈতিক দলকে অপ্রাসঙ্গিক করার অপচেষ্টা করছে। সেই সঙ্গে দলের নেতারা যে পরস্পর বিরোধী মন্তব্য করছেন সেটাও জাতীয় নাগরিক পার্টির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করছে।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে জাতীয় নাগরিক পার্টির অন্যতম সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ যে ফেসবুক পোস্ট করেছেন তা নিয়ে আজও বিতর্ক অব্যাহত। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তোলা হাসনাতের গুরুতর অভিযোগ নিয়ে যে ফেসবুক পোস্ট, কার্যত সেটাই অস্বীকার করেছেন, দলের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম সংগঠক সারজিস আলাম। এমনকি দলের তরফেও বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে এ ধরনের মন্তব্য কে জাতীয় নাগরিক পার্টি সমর্থন করে না। ফলে বলাই যায় এই ঘটনায় একদিকে যেমন মুখ পুড়েছে হাসনাত আব্দুল্লাহর অন্যদিকে মুখ পুড়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, হাসনাত আবদুল্লাহর মতো জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যে ধরণের মন্তব্য এবং অভিযোগ করেছেন, সেটা আসলে দেশের গঠনতন্ত্রকেই আক্রমণ করার সামিল। আর এর ফলে বিদেশী রাস্ট্রগুলিকে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দেয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রথম দিকে মুখ না খুললেও পরে তাঁরা যে বিবৃতি দিয়েছে, তাতেও বলা হচ্ছে হাসনাতদের বক্তব্য হাস্যকর এবং অপরিপক্কতার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এই একটি মন্তব্য এবং তার প্রতিক্রিয়া যে জাতীয় নাগরিক পার্টির ভাবমূর্তি কতটা নষ্ট করল সেটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন শীর্ষনেতৃত্ব। আপনারা হয়তো খেয়াল করেছেন, ইদানিং হাসনাত বা সারজিসরা সরাসরি কোনও মন্তব্য করছেন না। হয়তো তাঁদের সরাসরি মিডিয়ার সামনে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও বক্তব্য রাথতে বারণ করা হয়েছে। এটা যেমন পার্টির তরফেও নির্দেশ হতে পারে, তেমনই সেনাবাহিনীও তাঁদের সতর্ক করতে পারে। সবমিলিয়ে শুরুতেই তীব্র বিতর্ক বাঁধিয়ে বিপত্তি ডেকে আনলেন হাসনাত।
অন্যদিকে, সংস্কার এবং আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধকরণের দাবিতে বারবার জাতীয় নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার যে প্রচেষ্টা করে চলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতৃত্ব, তা কোনও ভাবেই মেনে নিতে নারাজ বিএনপি। ফলে তাঁদের সঙ্গে বিএনপি-র সরাসরি সংঘাত লেগে গিয়েছে। যদিও নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি পাশে পাচ্ছে জামায়তে ইসলামীকে। অনেকেই মনে করছেন, আগামীদিনে হয়তো এনসিপি এবং জামাতের জোট দেখা যাবে। সেই সঙ্গে আরও কয়েকটি ছোট ছোট রাজনৈতিক দল এই জোটে যুক্ত হবে। কিন্তু তাতেও কি তাঁরা নির্বাচনে সুবিধা আদায় করতে পারবে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য, এটা খুব কঠিন। কারণ, এই ছাত্রনেতারা এখনও রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্ক। আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন দেওয়ার চেষ্টা করছে সেনাবাহিনী। হাসনাত আবদুল্লাহ এই ধরণের অভিযোগ তোলার ঠিক পূর্বে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে জানিয়েছিলেন, এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কোনও পরিকল্পনা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেই। যা কোনও ভাবেই মেনে নিতে পারেনি জাতীয় নাগরিক পার্টি। তারপরই মাঝরাতে হাসনাতের ফেসবুক পোস্ট। এবং পরদিন সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সহ দেশের একাধিক শহরে তুমুল বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সভ্য সমর্থকরা। যা তাঁদের বিপক্ষেই গিয়েছে। এর তীব্র বিরোধীতা করেছে বিএনপি-সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলি এবং বাংলাদেশের বিশিষ্টজনেরা। ফলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনেও একটা ধারণা তৈরি হয়ে গিয়েছে, সদ্য গঠিত এই রাজনৈতিক দল দেশের সাংবিধানিক কাঠামোকেই টার্গেট করছে। ফলে তাঁরা যতই নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করুক না কেন, জনমানসে এখনও প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। যাতে আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে টেক্কা দেওয়া সম্ভব হবে।











Discussion about this post