পহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলার ১৫ দিনের মাথায় পাকিস্তানের মাটিতে বড়সড় হামলা চালাল ভারত। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এই হামলার পোশাকি নাম “অপারেশন সিঁদুর”। নয়া দিল্লি আগেই ঘোষণা করেছিল পহেলগাঁওয়ের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার জবাব ভারত নিজের পছন্দের সময়ে, নিজের পছন্দের জায়গায় দেবে। অবশেষে এল সেই সময়, মঙ্গলবার মধ্যরাতে পাকভূমে বড়সড় হামলা চালাল ভারতীয় বিমানবাহিনী। রাত একটার পর একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ল পাকিস্তানের একাধিক জায়গায়। ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হল একাধিক জঙ্গিঘাঁটি। বুধবার সকালে ভারতের বিদেশসচিব এক সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়েছেন, পহেলগাঁওয়ে ২২ এপ্রিলের সন্ত্রাসী হামলার প্রতি “পরিমিত এবং আনুপাতিক” প্রতিক্রিয়া ছিল এই আপারেশন সিঁদুর।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পহেলগাঁও হামলার পর থেকে একাধিকবার বলেছেন ভারত এর যথাযত জবাব দেবে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, পহেলগাঁও হামলায় জড়িত জঙ্গিরা এবং তাঁদের পিছনে থাকা মাস্টারমাইন্ডরা কল্পনাতীত সাজা পাবে। সেই সঙ্গে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীকে পুরোপুরি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন পাকিস্তানের মাটিতে জঙ্গিঘাঁটি ধ্বংস করার বিষয়ে। ভারতের এই মনোভাবে পাকিস্তানের পা কেঁপে গিয়েছিল। কখনও তাঁরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারস্থ হয়েছে, তো কখনও ইউরোপীয় দেশগুলির কাছে গিয়েছে। আবার রাষ্ট্রসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের কাছেও বিচার চাইতে গিয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু কোনও জায়গা থেকেই পাশে থাকার বার্তা পায়নি ইসলামাবাদ। একমাত্র তুরস্ক সরাসরি তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছিল। আর চিন তাঁদের পাশে থাকার বার্তা দেয় কিছুটা ঘুরিয়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোক বা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লদিমির পুতিন, প্রত্যেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাশে দাঁড়িয়ে সন্ত্রাসবাদ খতম করার বার্তা দিয়েছিল। তখনই দেওয়াল লিখন পড়ে নিয়েছিল শাহবাজ সরীফের প্রশাসন। তাই পাক তথ্যমন্ত্রী রাত দুটোর সময় সাংবাদিক বৈঠক করে বলেছিলেন ভারত ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তানে হামলা চালাতে পারে বলে তিনি বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পেয়েছেন। তবে ৩৬ ঘণ্টার কিছুটা বেশি সময় লাগলো ভারতের। মঙ্গলবার রাতে পাক নাগরিকরা ঘুম চোখে দিওয়ালী দেখলেন। মধ্যরাতেই আকাশের রঙ উজ্জ্বল লাল হয়ে উঠল ক্ষণে ক্ষণে। রাত ১টা ৫ মিনিট থএকে রাত ১টা ৩০ মিনিট, মাত্র ২৫ মিনিটের অপারেশন। তাতেই গুঁড়িয়ে গেল ৯টি জঙ্গিঘাঁটি। এরমধ্যে একটি আবার ভারত-পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার ভিতরে, বাওয়ালপুর এলাকায়। মার্কাজ সুভানাল্লাহ, যা জয়েশ-ই-মহম্মদ জঙ্গি সংগঠনের হেডকোয়ার্টার। আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গিঘাঁটিতে ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়েছে। যেমন, মার্কাজ তইবা মুরিদকে ক্যাম্প। পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে ১৮ থেকে ২৫ কিলোমিটার ভিতরে। এই জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেই প্রশিক্ষণ নিয়েছিল ডেভিড হেডলি বা আজমল কাসভের মতো মুম্বই হামলার জঙ্গিরা। আবার পাকিস্তানের শিয়ালকোটে অবস্থিত মেহমুনা জোয়া ক্যাম্প। এটিও পাকিস্তানের মাটিতে, সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার ভিতরে। জানা যায়, পাঠানকোট হামলার ছক এই ঘাঁটি থেকেই করা হয়েছিল। মঙ্গলবার রাতে ভারতীয় বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের আকাশসীমার প্রায় ১০০ কিমি ভিতরে ঢুকে হামলা চালিয়ে এল। অথচ টেরই পেল না পাকিস্তান সেনা। কলকাতা থেকে এই দূরত্ব বিচার করলে হবে বর্ধমান শহর।
ইতিমধ্যেই পাকিস্তান থেকে একের পর এক ধ্বংসের ছবি ও ভিডিও সামনে আসছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে ইমারত ও মসজিদে লস্কর বা জৈশের মতো জঙ্গি সংগঠন জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিত, এখন সেখানে শুধুই ধ্বংসের ছবি। ইমারতগুলির ছত্রে ছত্রে বিস্ফোরণের চিত্র। দেওয়াল ও মেঝেতে বড় বড় গর্ত। কয়েকটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছে যে ধরণের আগুনের গোলা রাতের আকাশ চিঁড়ে নেমে এসেছিল তাতে ভারী মাত্রার বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে সেটা পরিস্কার। বুধবার সকালে যে চিত্র এল, তাতে সেটা আরও ভালোভাবে প্রমান হল। নরেন্দ্র মোদি, পহেলগাঁও হামলার পর যা দাবি করেছিলেন, তা তিনি করে দেখালেন। কিন্তু প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের দাবি, এটা ছিল ভারতের প্রথম আঘাত, আরও কয়েকটি আঘাতের জন্য পাকিস্তানকে প্রস্তুত থাকতে হবে বলেই মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।












Discussion about this post