জাতীয় নাগরিক পার্টি-সহ বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল ও সংগঠনের নেতাদের দাবির মুখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও তাঁদের নেতাদের বিচার করা এবং বিচারকাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়নি, তাঁদের কখর্যক্রম নিষিদ্ধ হয়েছে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে গত বছর জুন ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ প্রায় ৭৬ বছরের রাজনৈতিক যাত্রায় একাধিকবার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে। তবে প্রতিবারই আওয়ামী লীগ আবার সংগঠিত হয়ে রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। কিন্তু এবার বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে আওয়ামী লীগ এবারই প্রথম কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ল। এবার কি আগের মতোই শেখ হাসিনার দল ফিরে আসতে পারবে?
আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালে। অর্থাৎ তখন বাংলাদেশ “পূর্ব পাকিস্তান” হিসেবেই পরিচিত ছিল। যদিও তখন”পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ” হিসেবে কাজকর্ম চালাতো এই দলটি। পরে ১৯৫৫ সালে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “আওয়ামী লীগ”। সেই মতে আওয়ামী লীগের জন্ম বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে। প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পেরোনোর আগেই দলটির ওপর প্রথম বড় ধাক্কা আসে ১৯৫৮ সালে। সেবার পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয়। সে সময় একটি অধ্যাদেশ জারি করে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন পাক সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খান। যার আওতায় আওয়ামী লীগও পড়েছিল। ফলে সে সময় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম ও সভা-সমাবেশ কঠোরভাবে দমন করায় দলটি অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। তবে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে, আওয়ামী লীগ পুনরায় সংগঠিত হয় এবং রাজনীতির মূলধারায় ফিরে আসে বলে জানান রাজনীতি বিশ্লেষকরা। এরপর শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদ-সহ তরুণ নেতারা আওয়ামী লীগকে নতুনভাবে সংগঠিত করেন এবং ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন, যা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। এই ছয় দফা দাবিকে ঘিরে ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত দলটি নানাভাবে দমন-পীড়নের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ।
বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে, এই নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক দমন-পীড়ন পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীনতা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দলটি আবার সংগঠিতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় ফিরে আসে। যুদ্ধ চলাকালীন শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে থাকলেও তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলীসহ দলটির সিনিয়র নেতারা ১০ই এপ্রিল ভারতের আগরতলায় “মুজিবনগর সরকার” গঠন করেন। ডিসেম্বরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণের পর আওয়ামী লীগের নেতারা ঢাকায় আসতে শুরু করে। ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি শেখ মুজিব কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে আসেন এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বর্তমান পরিস্থিতি আরও খারাপ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ বর্তমান ইউনূস সরকার এক সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী জানিয়েছে, আওয়ামি লিগের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের মাটিতে ওই দল কোনও কর্মসূচি পালন করতে পারবে না। ফলে শেখ হাসিনার পক্ষে আওয়ামি লিগের ফেসবুক পেজ মারফত ভাষণ দেওয়া সম্ভব হবে না। যদিও সোমবারই আওয়ামী নেত্রী শেখ হাসিনা এক ফেসবুক লাইভে এসে জানিয়েছেন, ইউনূস মার্কিন যুক্তরাষ্টের হাতের পুতুল। তাই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করে দিতে চলেছে মুহাম্মদ ইউনূস।
যদিও আওয়ামী লীগের জন্য একটা ভালো খবর হল, দল হিসাবে এখনই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশ মনে করছেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি অর্থাৎ পূর্বতন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের চাপে পড়েই আওয়ামী লীগকে নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবে অনেকেরই ধারণা, রাখাইন করিডোর নিয়ে সরকারের ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছিল, সেটা কমাতেই আওয়ামী লীগকে কার্যত নিষিদ্ধ করল ইউনূস সরকার। সরকারের এই নির্দেশিকার ফলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গেল আওয়ামী লীগের। ফলে সরাসরি নিষিদ্ধ করতে না পারলেও ঘুরিয়ে তা করে দিল মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার। আওয়ামি লিগ নেতৃত্ব সরকারিভাবে ইউনুস সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে এখনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি। কিন্তু সোমবার রাতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা। ভারতীয় কূটনৈতিক মহলের মতে, ভারত-পাক যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে হাসিনাকে তীব্র আঘাত হানলেন ইউনূস। কিন্তু ভারতের নজর এখনও ঢাকার দিক থেকে সরেনি। ফলে আগামীদিনে বড় কিছু পদক্ষেপ হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।












Discussion about this post