বুধবার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ‘দরবার’ হলে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জ়ামান মন্তব্য করেছিলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারে বিদেশিরা ঢুকে পড়েছে”। তিনি আরও বলেন, ‘ওই রাস্কেলরা দেশবিরোধী কাজকর্ম শুরু করেছে। আমি সেনাপ্রধান থাকতে সে কাজ করতে দেব না! এখানেই একাধিক প্রশ্ন উঠছে, জেনারেল ওয়াকার উজ জামান কোন বিদেশিদের কথা বলতে চেয়েছেন? তাঁরা কারা? সরকারি পদ, মন্ত্রিত্ব ও নানা কমিশনের প্রধান হিসাবে কি তাঁরা দায়িত্ব পালনের অধিকারী? কী বলছে বাংলাদেশের সংবিধান?
বাংলাদেশের বিশিষ্ট আইনজীবী এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞদের কথায়, বাংলাদেশে দ্বৈত নাগরিকত্ব আইনসিদ্ধ। তাই কারও কারও দুই দেশেরই পাসপোর্ট থাকতে পারে। এই আইনের বলে সমাজের বহু প্রভাবশালী এবং ধনী শিল্পপতিরা দ্বিতীয় কোনও দেশের নাগরিকত্ব গ্রহন করেছেন। তাঁরা বাংলাদেশে কম, বিদেশেই বেশি থাকেন। এ ক্ষেত্রে বেসিরভাগের প্রথম পছন্দ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া অথবা ইউরোপের কয়েকটি দেশ। তবে এখানে একটা কাঁটা আছে। দেশে দ্বৈত নাগরিকত্ব ব্যবস্থা চালু থাকলেও সেই দ্বৈত পাসপোর্টধারী ব্যক্তি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদ, নির্বাচন-প্রার্থী, সাংসদ, সচিব ও মন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসতে পারবেন না। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ নম্বর ধারায় এই বিষয়টি স্পষ্ট উল্লেথ করা আছে। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনকালে এই ধারা থোড়াই কেয়ার। জানা যায়, খোদ মুহাম্মদ ইউনূসই দ্বৈত পাসপোর্টধারী।
বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক সূত্রে জানা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, যিনি কার্যত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় উপদেষ্টামণ্ডলীর প্রধান তিনিই মার্কিন পাসপোর্ট ব্যবহার করেন। যদিও কর্মসূত্রে তাঁর বসবাস ফ্রান্সের প্যারিস শহরে। এও জানা যায়, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বাংলাদেশের কূটনৈতিক তথা লাল পাসপোর্ট নিয়েছেন। যার নম্বর ডি০০০১৭৭০৩ বলে সূত্রের খবর। এমনকি নতুন পাসপোর্ট নেওয়ার সময়ে পুরোনো পাসপোর্টের নম্বর উল্লেখ করার নিয়ম থাকলেও মুহাম্মদ ইউনূস তা করেননি। বাংলাদেশের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও ব্রিটিশ পাসপোর্ট ব্যবহার করেন। অর্থাৎ তিনিও বাংলাদেশ ও ব্রিটেনের দ্বৈত নাগরিক। যাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি হইচই সেই ডঃ খলিলুর রহমানও মার্কিন পাসপোর্ট ব্যবহার করে থাকেন। যদিও তিনি সম্প্রতি তা অস্বীকার করেছেন। বাংলাদেশের বিদেশ দফতর সূত্রের খবর, ইউনূস মন্ত্রিসভার বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাট দফতরের উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিনও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ছাড়া একাধিক দেশের নাগরিক। এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয় সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিক বাংলাদেশের পাশাপাশি সুইৎজ়ারল্যান্ডের নাগরিক। প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে নিযুক্ত আনিসুজ্জামান চৌধুরী আবার অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। আবার প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় নিযুক্ত আরও চারজন ইউনূসের সহকারী মোহাম্মদ সুফিউর রহমান, শেখ মইনউদ্দিন, ফয়েজ় আহমেদ তৈয়ব এবং আশিক চৌধুরীও বাংলাদেশের পাশাপাশি আমেরিকা বা ইউরোপের কোনও না কোনও দেশের নাগরিক।
অনেকেরই দাবি, সেনাপ্রধানের ‘রাস্কেল’ মন্তব্যের নিশানা ছিলেন খলিলুর রহমান। যিনি প্রথমে উপদেষ্টা মর্যাদায় রোহিঙ্গা বিষয়ক ‘হাই রিপ্রেজ়েন্টেটিভ’ নিযুক্ত ছিলেন। পরে মুহাম্মদ ইউনূস সুকৌশলে তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করে সেনাপ্রধানের সমান্তরাল হিসেবে তুলে ধরেন। তবে বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান আসল মৌচাকেই ঢিল মেরেছেন। তিনি কার্যত ৯ মাস ধরে চুপ ছিলেন। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চট্টগ্রামের কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি নির্মানের সুযোগ করে দেওয়ার বন্দোবস্ত করে দিতে চাইছেন বলেই অভিযোগ। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে আরাকান আর্মি-সহ বেশ কয়েকটি সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে মানবিক করিডোর দেওয়ার আড়ালে এই চক্রান্ত করছেন ইউনূস ও তাঁর বিদেশি সহযোগীরা। সেই কারণেই বাংলাদেশের সেনাপ্রধান গত বুধবার সেনাবাহিনীর আধিকারিকদের সামনে বলেন, ‘বিদেশিদের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় কখনওই বসব না। দেশের ভূখণ্ডের একটা সামান্য অংশ হারালেও তা ফিরে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সেনাপ্রধানের এই অবস্থানের কথা জানাজানি হতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলির একটা বড় অংশ আসরে নেমেছে। বৃহস্পতিবার ইউনূস ও খলিলুরের ইস্তফা দাবি করেছে বৃহত্তম সরকার-সমর্থক দল বিএনপি। তাঁদের বক্তব্য, সেনাপ্রধান কিন্তু একবারও ‘মার্শাল ল’ বা ইমার্জেন্সি-র হুমকি দেননি। বাংলাদেশে চিরটা কাল সেনারা গণতন্ত্র হরণ করেছে। এই প্রথম জেনারেল ওয়াকার যত শীঘ্র সম্ভব দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের তাগাদা দিচ্ছেন। উল্লেখ্য, বিএনপিও ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন চেয়ে বারবার সাওয়াল করেছে। এবার বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের থেকে সেরকমই নির্দেশ এল। আর তারপরই বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে একটাই চর্চা। ইউনূস কি তবে সত্যিই ইস্তফা দিয়ে দেশ ছাড়বেন? নাকি আবারও একটা ৫ আগস্ট দেখবে বাংলাদেশ!












Discussion about this post