বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রাজপথ জুড়ে ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে ইউনূস-সমর্থকদের পোস্টার। পোস্টারে পোস্টারে ছয়লাপ রাজপথ। তাতে স্পষ্ট বার্তা— “ইউনূসকে পাঁচ বছরের জন্য রাখতেই হবে”৷ কোথাও আবার লেখা “আগে সংস্কার, পরে নির্বাচন”। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়ে দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। গত বুধবার ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের দরবার হলে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের ভাষণের পর থেকে উত্তাল বাংলাদেশ। সেনাপ্রধান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন, আাগমী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন করাতে হবে, না হলে সেনাবাহিনী প্রয়োজয়নীয় ব্যবস্থা নেবে। এরপর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছে। ক্রমাগত চড়ছে উত্তেজনার পারদ। এই পরিস্থিতিতে মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন বলেই জানা গিয়েছে। কিন্তু তাঁকে যেতে দিতে নারাজ ছাত্র-জনতা নামে এক শ্রেণির মানুষ। মূলত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির ব্যানারে এই ছাত্র জনতা বা তৌহিদি জনতা বাংলাদেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছিল। মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগ করলে তাঁদের অস্তিত্বই এবার বিপন্ন হয়ে যাবে বলে মনে করছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ।
কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে, সেই আবহেই শনিবার দুপুরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা। এরপর বৈঠক শেষে বাংলাদেশের পরিকল্পনা উপেদষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা আমাদের সঙ্গে থাকছেন। উনি বলেননি উনি পদত্যাগ করবেন। অন্য উপদেষ্টারাও থাকছেন। আমাদের যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, আমরা সে দায়িত্ব পালন করতে এসেছি।
অর্থাৎ, বিনা যুদ্ধে ছাড়িব না সূচাগ্র মেদিনী। এমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। উল্লেখ্য, এর আগে তিনি বৈঠক করেছেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের সঙ্গে। সেখানেই মূলত সেনাপ্রধানের মোকাবিলা করার রূপরেখা তৈরি হয়ে যায় বলে মত বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। শুক্রবার থেকেই রাস্তায় নেমে যাওয়ার পরিকল্পনা হয় সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে। সেই মতো ঢাকার শাহবাগে ‘মার্চ ফর ইউনূস’ নামে একটি বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে রাষ্ট্রপতি করার দাবিও তোলা হয়েছে। শনিবার বিক্ষোভকারীরা রাজধানী ঢাকার সর্বত্র ব্যানার ও পোস্টারে ছয়লাপ করে দিয়েছে। বিক্ষোভের মূল দাবি হল, মুহাম্মদ ইউনূসকে পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় রাখা এবং নির্বাচন আয়োজনের আগে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কার সম্পন্ন করা। বিক্ষোভকারীদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন আয়োজনের আগে সংস্কার করাটা অত্যন্ত জরুরি। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এটা আদতে জাতীয় নাগরিক পার্টির পরিকল্পনা। তাঁরা ধীরে ধীরে গত বছরের জুলাই আন্দোলনের ধাঁচে এবার সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে তুলতে চায়। অন্যদিকে নি্র্বাচন নিয়ে চাপ দিচ্ছে বিএনপি-সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলও। কিন্তু শনিবার এক দলীয় মজলিসে জামাতের আমীর শফিকুর রহমান যে বক্তব্য রেখেছেন, তাতে রহস্য আরও ঘনিভূত হয়েছে। কারণ তিনি একদিকে যেমন সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন, তেমনই রাখাইন মানবিক করিডোর নিয়ে তদারকি সরকারের তাড়াহুড়ো করাটাও ভুল বলেছেন।
প্রসঙ্গত, শনিবার রাতেই প্রধান উপদেষ্টা বৈঠকে বসার কথা জামায়তে ইসলামী এবং বিএনপি নেতৃত্বের সঙ্গে। তার আগে জামাত আমীরের বক্তব্য যথেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, শনিবার দুপুরে উপদেষ্টা পরিষদের অনির্ধারিত বৈঠকে শেষে এক বিবৃতি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। তাতে জানানো হয়েছে, দেশকে স্থিতিশীল রাখতে, নির্বাচন, বিচার ও সংস্কারকাজ এগিয়ে নিতে এবং চিরতরে এ দেশে স্বৈরাচারের আগমন প্রতিহত করতে বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন বলে মনে করে উপদেষ্টা পরিষদ। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য শুনবে এবং সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করবে বলেও জানানো হয়। তাৎপর্যপূর্ণভাবে ওই বিবৃতির শেষের দিকে জানানো হয়েছে, কিন্তু সরকারের স্বকীয়তা, সংস্কার উদ্যোগ, বিচারপ্রক্রিয়া, সুষ্ঠু নির্বাচন ও স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে এমন কর্মকাণ্ড অর্পিত দায়িত্ব পালন করাকে অসম্ভব করে তুললে সরকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এখন দেখার, জামাত ও বিএনপির সঙ্গে আলোচনার পর যদি নির্বাচনের ইস্যুতেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাহলে পদত্যাগ করা ছাড়া কোনও উপায় থাকবে না মুহাম্মদ ইউনূসকে।












Discussion about this post