রবিবার বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঢাকায় নিজ সরকারি বাসভবন যমুনায় বৈঠকে বসেন মুহাম্মদ ইউনূস। সম্প্রতি তিনি পদত্যাগ করতে চেয়ে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তারপর থেকে বাংলাদেশ জুড়ে জোর চর্চা এই পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ কি স্বতঃস্ফূর্ত নাকি সাজানো নাটকের প্লট। ঘটনাপ্রবাহ বলছে, বাংলাদেশের তদারকি সরকারের প্রধান নাটক করছেন, তাঁর স্বপদে থেকে যাওয়ার সময় আরও বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য। এটা একটা বড় পরিকল্পনার অঙ্গ।
গত বুধবার বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভিতর সেনাকর্তাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে ডক্টর ইউনুসকে। সেইসঙ্গে বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে যে মানবিক করিডোর দেওয়া নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইউনুস সরকার সেটাও তিনি নাকচ করে দেন। ফলে মুহাম্মদ ইউনূস ও সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামানের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশে চলে আসে। এরপরই পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেন মুহাম্মদ ইউনুস। গত শুক্র ও শনিবার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান একের পর এক জরুরী বৈঠক করেন। এমনকি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বের সঙ্গেও বৈঠক করেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের উপদেষ্টা মন্ডলীর বৈঠক ডেকেছিলেন। তারপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তরফে একটি বিবৃতিও জারি করা হয়। সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছিল বাধা পেলে জনগণকে সঙ্গে নিয়েই তিনি পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন। এই বিবৃতি আসার পরেই বোঝা গিয়েছিল যে ইউনূসের পদত্যাগের বক্তব্য আসলে একটি নাটকই ছিল। কারণ ইতিমধ্যেই ইউনুসকে রাষ্ট্রপতি করে আরও পাঁচ বছর রেখে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির আড়ালে বিভিন্ন মঞ্চ।
এই পরিস্থিতিতে রবিবার বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঢাকায় নিজ সরকারি বাসভবনে বৈঠকে বসেন মুহাম্মদ ইউনূস। এর পর রাতের দিকে ডঃ ইউনূসের প্রেসসচিব শফিকুল আলম এক সাংবাদিক সম্মেলন করে যে বার্তা দেন, তাতে পরিষ্কার ইউনূস ফের একবার আওয়ামী লীগ তাস খেলে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চান। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিবের বক্তব্য, রবিবারে বৈঠকে ইউনূস জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের কর্মসূচি নিষিদ্ধ করার পরে সে দেশের ভেতরে ও বাইরে ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য এবং গোলামিতে ফেরত নিয়ে যাওয়ার জন্যই এ সব করা হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিবের বক্তব্য এহেন বক্তব্য থেকে স্পষ্ট তিনি এত সহজে পদত্যাগ করতে নারাজ। বিশেষ করে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন যে ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন হচ্ছে না, তার জন্য আরো ছয় মাস সময় তিনি নিচ্ছেন সেটাও স্পষ্ট করেছেন সফিকুল আলম।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিমণ্ডল সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। আর এর জন্য তিনি ফের একবার আওয়ামী লীগ ও পূর্বতন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বারস্থ হলেন। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পরে অস্থিতিশীল করার জন্য তারা সব রকম চেষ্টা করছে। এ থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। সেইসঙ্গে দেশ বড় যুদ্ধাবস্থার ভেতরে আছে ভুলে যে তিনি মন্তব্য করেছেন সেটাও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার পর মুহাম্মদ ইউনুসের বাংলাদেশের প্রবেশ আর শাসনভার হাতে নেওয়া বর্তমান বাংলাদেশ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে সে দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধারাবাহিক ভাবে ইউনূসকে নিশানা করে গিয়েছেন। আওয়ামী লীগের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে বারবার শেখ হাসিনার জ্বালাময়ী বক্তৃতা ভেসে উঠছে। শনিবারও হাসিনার একটি অডিয়োবার্তা প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানেও সংগঠনের কর্মসূচি নিষিদ্ধ করার জন্য ইউনূসকে আক্রমণ করেছেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা। ওই ভাষনেও দলের যাবতীয় কর্মসূচি নিষিদ্ধ করার জন্য মুহাম্মদ ইউনূসকে আক্রমণ করেছেন তিনি।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে আগামী দিনে কি হতে পারে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। মুহাম্মদ ইউনূস যিনি বৃহত্তর রঙ্গমঞ্চে পদত্যাগ নাটক মঞ্চস্থ করলেন তারপর সেখান থেকে সরে এলেন। অন্যদিকে বিএনপি, যারা আওয়ামী লীগ পরবর্তী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক দল তারাও ডিসেম্বরের মধ্যে ভোট চাইলেন। কিন্তু ইউনুস এখনো সেটা ২০২৬-এর জুন পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে চাইছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি অথবা বলা ভালো বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ওপর ভর করে এবং বাংলাদেশের কট্টরপন্থী মুসলিম সংগঠন গুলি যথা জামাতে ইসলামী, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা হিযবুত তেহরির মত সংগঠনের ডানায় ভর করে মুহাম্মদ ইউনূস আরও ছয়মাস ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইছেন। এখন দেখার বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান কোনও ব্যবস্থা নেন কিনা।












Discussion about this post