বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে যে মানবিক করিডোর দেওয়া নিয়ে সে দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে বিবাদ চরমে। গত ২১ মে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের দরবারে সেনাসদস্যদের সমর্থনে কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেছিলেন, “নো ব্লাডি করিডোর বিজনেস”। অর্থাৎ সেনাপ্রধান রাখাইন করিডর নিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের মধ্যে মিয়ানমারের রাখাইন করিডোর নিয়ে মতপার্থক্য অব্যাহত। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে যা ঘটে চলেছে তা গৃহযুদ্ধের থেকে কম কিছু নয় বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল।
সূত্রের খবর, ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন গত ২২ মে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট ধরে দোহা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যাচ্ছে, তিনি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি পরামর্শের জন্যই দেশে ফিরেছেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, তার পরই দোহা উড়ে গিয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। সূত্র বলছে, মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন বাংলাদেশ ছাড়ার কয়েক ঘন্টা আগেই প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় নাগরিক পার্টির কয়েকজন শীর্ষ নেতৃত্ব এবং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছিলেন। ফলে ধরে নেওয়া হচ্ছে, মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শের জন্যই যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছেন। এটা বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। কারণ, আগামী মাসেই বাংলাদেশের সেনাপ্রধান চিন সফরে যাচ্ছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এটা তাঁর প্রথম চিন সফর হবে। একদিকে যখন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চলে একটি সামরিক ঘাঁটি গড়তে উদ্যোগী, অন্যদিকে চিন উত্তরাঞ্চলে বিমানঘাঁটি গড়তে চায় লালমনিরহাটে। কূটনৈতিক মহল মনে করছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগুন নিয়ে খেলতে চাইছে। একদিকে তারা যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও হাতে রাখতে চাইছে অন্যদিকে চিনকেও।
প্রসঙ্গত, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা ধরণের হুমকি নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিআইএ। ওই প্রতিবেদনের একটি অংশে দাবি করা হয়েছে, আমেরিকাকে টেক্কা দেওয়ার জন্য চিন বিশ্বের কয়েকটি দেশে তাঁদের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করছে। এই তালিকায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নাম আছে। চিনের ব্যাপারে সতর্ক করে মার্কিন ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পূর্ব এশিয়ার প্রধান শক্তিধর দেশ হওয়ার কৌশলগত লক্ষ্য বজায় রেখেছে বেজিং। তাতে বলা হয়েছে, কূটনৈতিক সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমেরিকা ও তার মিত্রদের মোকাবিলা করার জন্য চিন বৈশ্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে চলেছে। চিনা পিপলস লিবারেশন আর্মির জন্য বহু দূরবর্তী স্থানেও সামরিক অবকাঠামো নির্মাণের উল্লেখও রয়েছে ওই প্রতিবেদনে। এই এই দূরবর্তী স্থানগুলির মধ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার রয়েছে। অর্থাৎ লালমনিরহাটে যে বিমান ঘাঁটি নির্মাণের কথা বলা হচ্ছে, সেটা হুমকি হিসেবেই দেখছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর উপর বাংলাদেশ সেনাপ্রধান চিন সফরে যাচ্ছেন। সেখানে অত্যাধুনিক যুদ্ধাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার চুক্তিও হতে পারে। যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোটেই ভালো চোখে দেখছে না।
এবার আসা যাক কয়েকটি কূটনৈতিক বিষয়ে। প্রথমে ঢাকায় অবস্থিত পাক হাইকমিশনার বাংলাদেশ ছাড়লেন। তাঁকে নাকি ফিরিয়ে নিয়েছে পাকিস্তান। এর ১১ দিনের মাথায় রাখাইন করিডোর ইস্যুতে সেনাবাহিনীর সংঘাত এবং ইউনূসের পদত্যাগ নাটক। সেই অবহেই ঢাকা ত্যাগ করলেন মার্কিং চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, গত একবছর ধরে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে স্থায়ী রাষ্ট্রদূত নেই। বরং এই সময়ে দুজন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত দায়িত্বে এসেছেন। রাখাইন করিডোর নিয়ে সেনাপ্রধানকে মানাতে না পাড়ার জন্য কি ফিরে যেতে হল ট্রেসি জ্যাকবসনকে? তিনি কি আদৌ ফিরবেন, নাকি অন্য কেউ আসবেন তাঁর জায়গায়? সেই প্রশ্নও উঠছে। ফলে বর্তমান ভূ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ খুব একটা সুবিধাজনক জায়গায় নেই। বরং ইউনূসের বাংলাদেশ বারুদের স্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে। এটা বলাই বাহুল্য।












Discussion about this post