বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করলেন সে দেশের প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। গত রবিবার বিকালে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে, ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় ওই বৈঠক হয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ছিলেন, তাঁকে সফর কাঁটছাঁট করে দেশে ফিরতে হয়েছে বলেই জানা যাচ্ছে। তবে এই বৈঠক অন্য আরেকটি দিক থেকে যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর আগে কখনও নির্বাহী বিভাগের প্রধান অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টারা এভাবে দেশের প্রধান বিচারপতিকে তলব করেছেন তার নজির নেই বললেই চলে। এটাই সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবার ঘটল। অবশ্য মুহাম্মদ ইউনূসের রাজত্বকালে অনেক ঘটনাই প্রথমবার ঘটছে বলেও কটাক্ষ করছেন কেউ কেউ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটা প্রথাবিরোধী ঘটনা। যদিও প্রধান উপদেষ্টা এবং প্রধান বিচারপতির মধ্যে ঠিক কোন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে তা জানা যায়নি। তবে সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম মানবজমিনকে বলেছেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে প্রধান বিচারপতির আলোচনা হয়েছে। তবে এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলকে নাড়িয়ে দিয়েছে বলেই জানা যাচ্ছে। কারণ, সম্প্রতি, একটি বিতর্ক দানা বেধেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতা নিয়ে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের বরিষ্ঠ আইনজীবী মহসিন রশিদ বাংলাদেশের হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন। তিনি মূলত মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতাই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ নেওয়া চ্যালেঞ্জ করেই রিট দাখিল করেন তিনি।
তবে বিচারপতি ফাতেমা নজীবের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রিট পিটিশন খারিজ করে দিয়েছিলেন। বিচারপতি তাঁর আদেশের পর্যবেক্ষণে বলেন, বাংলাদেশের জনগণ অন্তর্বর্তী সরকারকে বৈধ বলে মেনে নিয়েছে কাজেই এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে না। কিন্তু সম্প্রতি সেনাবাহিনী ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যে বিরোধের আবহে সেনাবাহিনীর তরফে একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। গত বছর জুলাই বিপ্লব এবং গণ অভ্যুত্থানের সময় যারা প্রাণভয়ে সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই তালিকাই প্রকাশ করে সেনাবাহিনী। তাতে দেখা যাচ্ছে, তৎকালীন সেনাপ্রধানও সেনানিবাসে ছিলেন। এখানেই প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কিভাবে শপথ নিল? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে জেনে নেওয়া যাক এই ১০৬ অনুচ্ছেদে কি বলা আছে। বাংলাদেশ সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগের প্রথম পরিচ্ছদে বলা হয়েছে, যদি কোনও সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হয় যে, আইনের এই রূপ কোনও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে বা উত্থাপনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যা এমন ধরণের ও এমন জনগুরুত্বসম্পন্ন যে, সেই সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন। তা হলে তিনি প্রশ্নটি আপীল বিভাগের বিবেচনার জন্য প্রেরণ করতে পারেন। এবং উক্ত বিভাগ স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত শুনানির পর প্রশ্নটি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে স্বীয় মতামত জ্ঞাপন করতে পারেন।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ৮ আগস্ট বাংলাদেশে এমন সংকট দেখা দিয়েছিল। গণ অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর। ফলে প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রপতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে সেই সময় কার কাছে আপিল করেছিলেন। যেখানে সেনাবাহিনীর প্রকাশ করা তালিকায় দেখা যাচ্ছে গত বছর ৮ আগস্ট বাংলাদেশ তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের আরেকজন বিচারপতি সেনানিবাসে আত্মগোপন করেছিলেন। তাহলে রাষ্ট্রপতি কাঁদের পরামর্শ নিলেন? বিতর্ক ঠিক এখানেই। মনে করা হচ্ছে, মুহাম্মদ ইউনূস সম্ভবত জরুরি ভিত্তিতে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ডেকে এনে বর্তমান প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এই বিষয়েই আলোচনা করেছেন। বা তাঁর গদি বাঁচানোর নতুন কোনও ফন্দি এঁটেছেন। জানা যায়, শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট “টার্মস অফ রেফারেন্স” নির্ধারণ করে দিয়েছিল। কারণ, বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তবর্তীকালীন সরকারের কোনও বিধান নেই। ফলে সুপ্রিম কোর্ট আইনের মধ্যে থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ও কাজের পরিধি নির্ধারণ করে দিয়েছিল বলেই জানা যায়। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ইউনূস সরকার বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্কার ও অন্যান্য বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করে চলেছে। যা নিয়েও বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৬ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করছেন, যা গুরুতর অপরাধ। সেই সঙ্গে দ্রুত নির্বাচন করানোর যে দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে দিয়েছিল সেটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। ফলে ইউনূসের কাছে আরও বেশিদিন ক্ষমতায় থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে বলেই মত বিশেষজ্ঞ মহলের।












Discussion about this post