প্রথমে পদত্যাগের নাটক, তারপর জুন পর্যন্ত থেকে যাওয়ার বার্তা। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস যে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য অনেক কিছুই করতে পারেন তা আজ প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এটা মেনে নিতে নারাজ। নির্বাচন ডিসেম্বর না জুন? কি করতে পারে বিএনপি?
“মুহাম্মদ ইউনূস দেহত্যাগ করতে পারেন পদত্যাগ করবেন না। বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় যেন হক কথাই বলেছেন। বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের সঙ্গে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে “মানবিক করিডোর” দেওয়া নিয়ে যে দ্বন্দ্ব বেঁধেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের, তাতে যথেষ্ট চাপে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ২২ মে থেকে যা নিয়ে টানা পড়ে চলছে সেনাবাহিনী ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যে। এরই মাঝে মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগ করতে চেয়ে একটা আবেগী চাল চেলেছিলেন। ভেবেছিলেন, তাঁর পদত্যাগের ইচ্ছাপ্রকাশের পরই গোটা বাংলাদেশ ভেঙে পড়বে তাঁকে আটকাতে। কিন্তু তেমনটা হয়নি। উল্টে দেখা গেল, একমাত্র তাঁর ধামাধারী জাতীয় নাগরিক পার্টি ও ছাত্র নেতারাই কেবল তাঁর পাশে আছে। বাকিরা সেনাপ্রধানের সুরেই আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন চাইছেন। ফলে প্রবল চাপে পড়া ইউনূস সাহেব ফের একবার আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা ও ভারত বিরোধিতার আওয়াজ তুললেন। তাতেও কাজ হল না, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন করানো নিয়ে অনড়।
আসলে নির্বাচন যত দেরি করে হবে ততই চাপ বাড়বে বিএনপির উপর। এই মুহূর্তে বিএনপি’র সামনে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। বাংলাদেশী বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ কার্যত নিশ্চিহ্ন। নেত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন, তাকে শতাধিক মামলা মকদ্দমায় এমন ভাবে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে তিনি এই মুহূর্তে দেশে ফিরতে পারবেন কিনা সন্দেহ। প্রায় ৯০ শতাংশ আওয়ামী নেতা হয় বিদেশে, না হয় জেলে। ফলে বিএনপির সামনে কার্যত ফাঁকা মাঠ। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেপথ্যে যতই কলকাঠি নারুক না কেন তাদের জন্য ভিত্তি এখনও অনেক কম। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘকাল নিষিদ্ধ থাকা জামাত -বিএনপির সঙ্গে জোট করে গত নির্বাচনে লড়েছিল। খাতায়-কলমে এখনও তাদের জোট রয়েছে। যদিও তাদের দূরত্ব বেড়েছে ইতিমধ্যে। মুহাম্মদ ইউনূস যে বারবার নির্বাচন পিছিয়ে দিতে চাইছেন, তা আসলে জামাত ও জাতীয় নাগরিক পার্টিকে সুবিধা করে দিতেই। এটা বুঝতে সমস্যা হচ্ছে না বিএনপি শীর্ষ নেতৃত্বের। তাই তাঁরা ডিসেম্বরের মধ্যেই ভোট চেয়ে চাপ বাড়াতে চাইছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে মুহাম্মদ ইউনূস যে আগামী বছর জুন মাসে নির্বাচনের কথা বলছেন, তার পিছনে জটিল একটা অঙ্ক আছে। সাধারণত জুন-জুলাই বর্ষার মরসুম। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশে বর্ষাকালে জাতীয় নির্বাচন করানোটা অলীক কল্পনার সামিল। ওই সময় বাংলাদেশের বেশিরভাগ জায়গায় বন্যা পরিস্থিতি থাকে। আবার জুন জুলাইয়ের আগে পবিত্র রমজান মাস থাকায় ভোট করানো সম্ভব নয়। ফলে ইউনুস সাহেব যতই জুন মাস অব্দি সময় নিয়ে থাকুক না কেন, আদৌ সেই নির্বাচন বিভিন্ন কারণে পিছিয়ে যেতে পারে বলেই আশঙ্কা করছেন বিএনপি নেতারা। পাশাপাশি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কর্মসূচি নিষিদ্ধ করা বা আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিলের মত সিদ্ধান্ত বুমেরাং হয়ে ফিরতে পারে বলেও আশঙ্কা বিএনপি’র। কারণ, যত সময় যাচ্ছে, ততই আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের রাগ, ক্ষোভ কমছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে আওয়ামী লীগের মিছিলের বহর। এটা বিএনপির কাছে সিঁদুরে মেঘ। তাই নির্বাচন নিয়ে তারেক রহমান, মির্জা ফকরুল বা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়দের এতো তাড়াহুড়ো। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, শেখ হাসিনার বিদায়ে যারা সবচেয়ে লাভবান হতো, এখন তাঁরাই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত।












Discussion about this post