বাংলাদেশের প্রথমসারির সংবাদপত্র প্রথম আলোর একটি সংবাদ শিরোনাম “কারফিউ শিথিল, গোপালগঞ্জে স্বস্তি ফিরছে”। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও এবং লেখায় দেখা যাচ্ছে, গোপালগঞ্জকে কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এমনকি গোপালগঞ্জের আশেপাশে সমস্ত নদীতে নৌবাহিনীর ছোট লঞ্চ মোতায়েন করা হয়েছে। যাতে কেউ গোপালগঞ্জ ছেড়ে পালাতে না পারে। অন্যদিকে, প্রথম আলো লিখেছে, গোপালগঞ্জে তিন দিনের কারফিউর পর জনজীবনে ধীরে ধীরে স্বস্তি ফিরছে। আজ শনিবার সকাল ছয়টা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক মুহম্মদ কামরুজ্জামান। এতে স্বাচ্ছন্দ্যে ঘর থেকে বের হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। খুলতে শুরু করেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও। কিন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা বড় অংশ অবশ্য আশঙ্কা করছেন আরও বড় গোলমালের।
গোপালগঞ্জ গণহত্যা নিয়ে ফের একবার বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন সে দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তথা আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর কথায়, ‘গত বুধবার গোপালগঞ্জে আমাদের সেনাবাহিনী যা করেছে, ১৯৭১ সালে পাক সেনাও তা করেনি। হাসিনার অভিযোগ মারাত্মক। প্রসঙ্গত, মুক্তিযুদ্ধের সময় গোপালগঞ্জে পাকিস্তানি কিছু সেনা লঞ্চে করে ঢুকেছিল। অন্যদিকে, গোপালগঞ্জেও গত ১৬ জুলাই, বাংলাদেশের সেনা গিয়েছিল যুদ্ধ সরঞ্জাম নিয়ে।’পরে লঞ্চে করে নৌবাহিনীকেও দেখা টহল দিতে। গোপালগঞ্জের রাস্তায় দেখা গিয়েছে সেনাবাহিনীর আর্মাড ভেহিকেল বা সেনা ট্যাঙ্ক। যাতে করে এনসিপি নেতাদের লুকিয়ে সেখান থেকে বের করে আনা হয়েছিল। যে দৃশ্য ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। শেখ হাসিনার অভিযোগ, আওয়ামী লিগের বিক্ষোভ মোকাবিলায় গোপালগঞ্জে সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক, কামান নিয়ে নেমেছিল। এমনকি তাঁরা নির্বিচারে গুলি করতেও পিছপা হয়নি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দাবি, চার-পাঁচজনকে আড়াল করতে সেনা আমাদের লোকেদের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, ‘দুর্ভাগ্যের হল, সেনাবাহিনীকে এই সব অস্ত্র আমি প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় কিনে দিয়েছিলাম। সেই অস্ত্র কি দেশের মানুষকে মারার জন্য কিনে দিয়েছিলাম?’
এই ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত গণহত্যা’ বলছে আওয়ামি লিগ। এর প্রতিবাদে একদিকে যেমন তীব্র আন্দোলনের ডাক দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তেমনই সেই তীব্রতার সুর আরও চওড়া করে মুহাম্মদ ইউনুসের বাসভবন যমুনা পর্যন্ত ‘লং মার্চে’র ডাক দিয়েছেন সর্বোচ্চ নেত্রী শেখ হাসিনা। এমনকি বিষয়টি গোটা বিশ্বের কাছে তুলে ধরা হবে বলেও সাফ জানিয়েছেন আওয়ামী নেত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের কৌতুহল, ইউনুসের বাসভবন যমুনা পর্যন্ত ‘লং মার্চ’ নিয়ে। এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগের যা শক্তি, তাতে গোপালগঞ্জের মতো প্রতিরোধ বাংলাদেশের সব জেলা বা রাজধানী ঢাকায় করা সম্ভব নয়। তাহলে কিসের উপর ভিত্তি করে আওয়ামী নেত্রী লং মার্চের ডাক দিলেন? তবে কি ভিতর ভিতর প্রস্তুতি সারা হয়ে গিয়েছে তাঁর। সর্বভারতীয় কয়েকটি সংবাদমাধ্যম আগেই দাবি করেছে, শেখ হাসিনা নয়া দিল্লির অজ্ঞাতবাস থেকেই বাংলাদেশের ভিতর তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে লাগাতার যোগাযোগ রেখে চলেছেন। তিনি তলে তলে আওয়ামী লীগের সংগঠন নতুন করে তৈরি করছিলেন। বিভিন্ন এলাকায় তরুণ ও উদ্যোমী নেতা বেছে নিয়েছেন পরবর্তী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। কিন্তু তবুও একটা প্রশ্ন থেকে যায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল বা লং মার্চ করে ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর শক্তি ও সাহস কি দেখাতে পারবে আওয়ামী লীগ। যেখানে তাঁদের যে কোনও মূল্যে দমন করতে কোনও কসুর ছাড়ছে না মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, পুলিশ ও সেনাবাহিনী। গোপালগঞ্জে সেনাবাহিনীর অতি সক্রিয়তাই তার প্রমান।
প্রসঙ্গত, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে হড়তালের ডাক দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু সে হড়তাল সফল হয়নি। গোপালগঞ্জের হত্যালীলার প্রতিবাদে রবিবারও হড়তালের ডাক দিয়েছে আওয়ামী নেতারা। কেউ কেউ বলছেন, ফেসবুকে হড়তাল ডাকা সহজ, কিন্তু এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ আওয়ামী নেতাই উপস্থিত নেই। ফলে সাংগঠনিকভাবে হড়তাল হোক বা ঢাকা পর্যন্ত লং মার্চ সফল করার মতো শক্তি কিভাবে জোগার করবেন তাঁরা? তবে একটা বিষয়ে প্রায় সকলেই একমত, গোপালগঞ্জের ঘটনা আওয়ামী লীগের জন্য বাড়তি অক্সিজেন জোগান দিল। যা তাঁদের আগামীদিনের লড়ায়ের সামর্থ্য এনে দেবে।












Discussion about this post