এক বছর হতে চলল বাংলাদেশ ছেড়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। তাঁর দল আওয়ামী লীগের যাবতীয় রাজনৈতিক কাজকর্মে জারি হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। তাঁদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের ওপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন আবার আওয়ামী লীগের নিবন্ধনও বাতিল করেছে। আবার ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলছে একাধিক মামলা। ফলে বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সবচেয়ে কোনঠাসা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ও তিনি নিজে। তবুও কেন আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে আতঙ্কে ভুগছেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস? শুধু তিনি একা নন, একই আতঙ্কে ভুগছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি, জামায়তে ইসলামী সহ একাধিক মুসলিম সংগঠন। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছেন বাংলাদেশের তামাম রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
হাসিনা আতঙ্ক যেন পিছুই ছাড়ছে না বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন শিবিরের। শত চেষ্টা তাঁরা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে হাসিনা ও তাঁর রাজনৈতিক দলকে বাংলাদেশ থেকে দূরে ঠেলে রাখা যায়। কিন্তু যে রাজনৈতিক দলের ইতিহাস বাংলাদেশের জন্মেরও আগে থেকে রয়েছে, সেই দলকে কি এভাবে মুছে ফেলা যায়? আবার যে নেত্রী বাংলাদেশের মুক্তি সূর্য তথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কন্যা, তিন বারের প্রধানমন্ত্রী, তাঁকেই বা কিভাবে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলবেন? ফলে সে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, ব্যর্থ চেষ্টা করছেন মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর বাহিনী। শনিবার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মহম্মদ ইউনূস ১৪টি রাজনৈতিক দল ও জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে। এরপর এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, পতিত শক্তি বা আওয়ামী লিগ গন্ডগোল লাগিয়ে নির্বাচন ভন্ডুল করে দেওয়ার অপচেষ্টা করছে। এই অপচেষ্টাকে আটকাতে সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
বাংলাদেশের প্রথম সারির সংবাদ মাধ্যম প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, “গণ অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত সকল শক্তি মিলে যদি একটি সুন্দর নির্বাচন করতে না পারি, তবে মস্ত বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে। পরাজিত শক্তি যখনই সুযোগ পাচ্ছে, তখনই গন্ডগোল তৈরি করছে। দেশের অগ্রগতিকে আটকাচ্ছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, যখনই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে আমরা অগ্রসর হচ্ছি, তখনই নানা ষড়যন্ত্র সামনে আসছে। কিন্তু বাস্তব হল, কোনও ষড়যন্ত্র করেই গণতান্ত্রিক অগ্রগতিকে বাধা দেওয়া যায় না।
উল্টোদিকে আওয়ামী লীগের দাবি, মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই গণতন্ত্রকে অস্বীকার করছেন। কারণ এভাবে কোনও অন্তর্বর্তী সরকার একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপাতে পারে না। এটা বাংলাদেশের সংবিধান বিরোধী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইনজ্ঞদের অনেকেই এই বক্তব্যের সমর্থন করছেন। তাঁরাও বলছেন, আওয়ামী লীগকে অবৈধভাবে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতা-কর্মীকে আশ্রয় দিয়েছে। নয়া দিল্লি প্রথম থেকেই বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠ, অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন চেয়ে আসছে। ভারতের এই দাবিতে কার্যত কর্ণপাত করছে না ইউনূস সরকার। তাঁরা যে কোনও মূল্যে চাইছে আওয়ামী লীগকে আসন্ন নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে। কিন্তু আসল চাপ এবার পশ্চিমী দেশগুলি থেকে আসতে শুরু করেছে। ইউরোপেরে বিভিন্ন দেশ ও আমেরিকাও এবার অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের কথা বলছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যাতে অংশ নেয়। জাতিসংঘও এই কথা স্পষ্ট বলে দিয়েছে। ফলে ইউনূসের ওপর এখন প্রবল চাপ। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই চাপ থেকে বের হতেই মুহাম্মদ ইউনূসের মুখে ফের আওয়ামী লীগকে নিয়ে আতঙ্কের কথা শোনা গেল। আসলে তিনি দেশবাসীকে শোনালেন বা তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে আওয়ামী লীগ মানেই স্বৈরাচারী, তাঁরা চায় না বাংলাদেশে ভালোভাবে নির্বাচন হোক। তাই আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে আটকাতে সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানালেন ৮৪ বছরের বৃদ্ধ শাসক।
আসলে প্রশ্ন এখানেই, আচমকা নিজের অবস্থান বদলে কেন তিনি বাংলাদেশে নির্বাচন ঘোষণা করতে চাইছেন? এর আগে বারেবারে তিনি নির্বাচন নিয়ে ডিগবাজি খেয়েছেন। কখনও আগামী বছরের জুন মাস তো কখনও এপ্রিল। আবার বিএনপির সঙ্গে বৈঠকের পর আগামী বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে নির্বাচন হবে বলেছিলেন। এখন বলছেন ৪-৫ দিনের মধ্যেই ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা করবেন। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ইউনূস সাহেব বুঝতে পেরেছেন তাঁর মাথার উপর ছাদ ও পায়ের তলার মাটি নেই। তাই এখন সেফ এগজিট খুঁজছেন। বিদেশী যে শক্তি তাঁকে বাংলাদেশের মসনদে বসিয়েছিল, তাঁরা এখন সরে গিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে তাঁর জনপ্রিয়তা দ্রুত কমছে, বিএনপি-সহ বহু রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্টজনেদের একাংশ তাঁর পাশ থেকে সরে গিয়েছে। ফলে আর বেশিদিন তিনি টানতে পারবেন না, এটা বুঝে গিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। অন্যদিকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এবার বুঝতে পারছেন তাঁরা বড় ভুল করেছেন। শেখ হাসিনার আমলে যে বাংলাদেশ ছিল, আজ তা নেই। বাংলাদেশ এখন এমন বিশ্রীঙ্খল ও অরাজক পরিস্থিতিতে যে আগামীদিনে তাঁদের পেটের ভাত জোগাড় হবে কিন্স সন্দেহ। বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। ফলে হাসিনা ছাড়া কেউ যে বাংলাদেশকে টেনে তুলতে পারবেন না, এটা বুঝতে পারছেন সে দেশের আম জনতা। তাই শেষ চেষ্টায় রয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি জানেন, হাসিনা ফিরবেন, তখন তাঁর পরিত্রান নেই।












Discussion about this post