বাংলাদেশে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, অল্প দিনের মধ্যে তিনি এই বিষয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেবেন। অর্থাৎ, জুলাই সনদ ঘোষণা হল, তাঁর কাজ ফুরোলো, এবার তবে নির্বাচন। বিষয়টা এভাবেই দেখছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল।
বছর ঘুরল সেই ৫ অগস্টের। গত বছর এই দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাস বহুদিন স্মরণে রাখবে। এক ঝলকে ফিরে দেখা যাক সেই দিনটি। ৫ অগস্ট সকাল থেকে একের পর এক ঘটনা। ১৬ বছর ধরে গেড়ে বসা শেখ হাসিনা সরকারের শিকড় একটার পর একটা ওপড়ানো হচ্ছে। সেনা-মোতায়েন অগ্রাহ্য করে দুপুরে ঢাকার রাস্তায় নেমে প্রথম বিক্ষোভ-মিছিলটি সংগঠিত করেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মীরা। এরপর একের পর এক মিছিল বের হতে শুরু করল ঢাকার রাস্তায়। আগের দিনই নাকি বাংলাদেশ সেনার মাঝারি আর নিচু স্তরের জওয়ানরা সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ় জামানকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, বিক্ষোভ দমনে তাঁরা সাধারণ মানুষের দিকে বুলেট ছুড়বেন না। ঘটনাচক্রে হলও তাই। পরদিন সকাল হতেই কাতারে কাতারে মানুষ ঢাকার রাস্তায়। গণভবনে তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁকে উৎখাত করতে এগোচ্ছেন হাজারে হাজারে বিক্ষোভকারী ছাত্র-জনতা। জানা যায়. সে সময়ই নাকি ‘ব্যাক চ্যানেলে’ নয়া দিল্লিকে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ় জামান জানিয়েছিলেন, অভ্যুত্থান এখন কিছু সময়ের অপেক্ষা। প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে আশ্রয় দিন, না হলে….। হলও তাই, হাসিনা পালিয়ে এলেন দিল্লি, আর গণভবনের দখল তখন উন্মত্ত জনতার হাতে। সেই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি হল বাংলাদেশে। আর মহাসমারহে তা পালন করলেন মুহাম্মদ ইউনূস সাহেব। কিন্তু মানিক মিঁয়া অ্যাভিনিউতে দূরবীন দিয়েও কাতারে কাতারে মানুষ খুঁজে পাওয়া গেল না। সবই কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা। ৮ জোড়ে বিশেষ ট্রেন চালানো হলেও, তাতে লোকজন নেই। ঢাকায় ট্রাফিক জ্যামও অন্যান্য দিনের তুলনায় কম। কেন এমনটা হল?
আসলে বিগত এক বছরের হিসেব মেলাতে গিয়ে হতাশ হয়েছেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ! তাঁদের অভিযোগ, নোবেলজয়ী ইউনুস এই এক বছরে নিজের সংস্থাগুলির জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার সুবিধা নিশ্চিত করে নিয়েছেন। প্রত্যাহার করে নিয়েছেন নিজের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলাও। উল্টোদিকে মিথ্যা ও ভুয়ো মামলায় হাজার হাজার মানুষকে জড়িয়েছে তাঁর সরকার। একাধিক ভুয়ো মামলায় তিনি জেলে ভরেছেন সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী থেকে শ’খানেক সাবেক সাংসদ, সংখ্যালঘু ধর্মগুরু, এমনকি প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার থেকে শুরু করে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতিকেও। দেশে গণতন্ত্র ফেরানোর কথা বলে দেশজুড়ে পত্তন করেছেন এক শক্তপোক্ত গুণ্ডাতন্ত্র বা মব সংস্কৃতি। যার নেতৃত্ব দিচ্ছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা জামায়াতে ইসলামি, ইসলামি কট্টরপন্থী সংগঠন হেফাজতে ইসলাম এবং ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি, যাকে ঠাট্টা করে বাংলাদেশেরই জনগণ ডাকেন ইউনূসের দল বা কিংস পার্টি। এই এক বছরে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশকে কার্যত বিক্রি করে দিয়েছেন। বিদেশী সংস্থাগুলি থেকে বিপুল পরিমান ঋণ নিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করার নামে গোপন অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি করে দেশকে গাড্ডায় ফেলেছেন। সবচেয়ে বড় কথা, শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচারি বলে আখ্যা দিয়ে, নিজেই ‘স্বৈরশাসন’ প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলাদেশে। তিনি তদারকি সরকারের প্রধান হয়েও একের পর এক বিতর্কিত অধ্যাদেশ জারি করেছেন। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী ও কবি সাহিত্যিক মহলে বলাবলি শুরু হয়েছে, মুহাম্মদ ইউনূস দেশকে গোল্লায় পাঠিয়েছেন। আর নিজের আখেড় গুছিয়ে নিয়েছেন।
অবশেষে বিএনপিকে খুশি করতে ফেব্রুয়ারি মাসে ভোট হবে বলে দিলেন মুহাম্মদ ইউনূস। অন্যদিকে জামাত-এনসিপিকে খুশি করতে জুলাই সদন বা ঘোষণাপত্র পাঠ করলেন মুহাম্মদ ইউনূস। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা মারা গিয়েছেন, তাদের জাতীয় বীর এবং আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা পাবে আইনি সুরক্ষা। পাশাপাশি এই ঘোষণাপত্র বাংলাদেশের মূল সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ঘোষিত জুলাই ঘোষণাপত্রে। অভিযোগ, এই ঘোষণাপত্রে মুক্তিযুদ্ধের সেভাবে উল্লেথ নেই। যা নিয়ে ক্রমশ ক্ষোভ জমছে সাধারণ মানুষ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্তদের মধ্যে। বোঝাই যাচ্ছে, তিনি মূলত জামাত ও এনসিপি নেতাদের খুশি করতে এই ঘোষণাপত্র পাঠ করেছেন। কিন্তু জাতীয় নির্বাচন নিয়ে তাঁর বলা কথা নিয়ে রয়ে গেল মস্ত বড় ফাঁক। ইউনূস সাহেব জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, এবার খুশিমনে সবাই ভোট দিতে পারবেন। কিন্তু আদৌ কি তাই? আওয়ামী লীগ-সহ ১৪ দলের ভোটাররা কী ভোট দিতে পারবেন? অধরা থেকে গেল সেই প্রশ্নের উত্তর।












Discussion about this post