বাংলাদেশে জুলাই গণ অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তির দিনেই জাতীয় নাগরিক পার্টি’র বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার হঠাৎ কক্সবাজারে যাওয়া নিয়ে জোরদার বিতর্ক বেঁধেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে। স্থানীয় কয়েকটি গণমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়েছে, ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠক করতেই তারা কক্সবাজারে গিয়েছিলেন। আর তাতেই আগুনে ঘি পড়ে। এও জানা যাচ্ছে, যে পাঁচতারা হোটেলে ওই এনসিপি নেতারা অবস্থান করছিলেন, সেই হোটেল কার্যত ঘিরে ফেলেন স্থানীয় বিএনপি কর্মী-সমর্থকরা। প্রায় শপাঁচেক বিএনপি সমর্থক বিক্ষোভও দেখিয়েছেন। কেন এই বিক্ষোভ, কেনই বা এত বিতর্ক। সেটা বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে এই পিটার হাস কে?
পিটার হাস ঢাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৭তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সেই জুলাই মাসেই বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠে হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, পিটার হাস চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশে আর স্থায়ী রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। প্রসঙ্গত, ট্রাম্প জমানায় পিটার হাস আর মার্কিন বিদেশমন্ত্রকে কর্মরত নন। তিনি এখন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রফতানিতে যুক্ত মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির কৌশলগত উপদেষ্টা। প্রশ্ন উঠছে, গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনেও কেন এনসিপি নেতারা কক্সবাজারে গেলেন। যদিও এনসিপি এই দাবি নস্যাৎ করেছে। এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, তাঁরা ঘুরতে কক্সবাজার গিয়েছেন। পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি গুজব ও অপপ্রচার। যদিও ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ওই পাঁচ নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। তাঁরা ওই পাঁচজনকে শো-কজ নোটিশ ধরিয়েছে। এনসিপির এই পাঁচ নেতা হলেন- সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, তাসনিম জারা ও খালেদ সাইফুল্লাহ।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিবের স্বাক্ষর করা ওই শো-কজ নোটিশে বলা হয়েছে- ‘৫ই অগাস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তি ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসে আপনি এবং দলের আরও চার কেন্দ্রীয় সদস্য ব্যক্তিগত সফরে কক্সবাজার গিয়েছেন। এই সফর সংক্রান্ত কোনও তথ্য কিংবা ব্যাখ্যা ‘রাজনৈতিক পর্ষদ’ এর নিকট পূর্বে অবগত করা হয়নি’। নোটিশে আরও বলা হয়েছে, এমতাবস্থায় আপনার এই সিদ্ধান্তের কারণ ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আহবায়ক জনাব মোঃ নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেনের নিকট স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান করার জন্য আপনাকে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করছি। এনসিপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ওই পাঁচজনকে করা আলাদা শোকজ নোটিশের কপি প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি গুরুতর। শুধুমাত্র হাওয়া খেতে জাতীয় নাগরিক পার্টির পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ নেতা কক্সবাজার গেলেন, সেটা মেনে নিতে পারেছে না বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল। উল্লেখ্য এই কক্সবাজারেই এনসিপির মঞ্চ ভেঙে ধাওয়া করেছিল বিএনপি। আবারও কক্সবাজারের পাঁচতারা হোটেলের সামনে তাঁরা বিক্ষোভ দেখালো।
জানা যায়, মঙ্গলবার সকালে বিমানে করে কক্সবাজার পৌঁছান উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের দুই মূখ্য সংগঠক সারজিস আলম এবং হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন, সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা এবং তার স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহ, যিনি এনসিপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক পদে রয়েছেন। এই পাঁচজনই বাংলাদেশে যথেষ্ট হেভিওয়েট। গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির দিন সকালেই তাঁরা কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে হাওয়া খেতে যাবেন, এ দৃশ্য কল্পনাতেও আনতে পারছেন না সে দেশের মানুষ। যেখানে ঢাকার মানিক মিঁয়া অ্যাভিনিউতে বিশাল আয়োজন করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ভিতরের খবর, তাঁরা সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বা তাঁর কোনও প্রতিনিধির সঙ্গেই দেখা করতে গিয়েছিলেন। পিটার হাস এখন যে সংস্থায় কর্মরত, সেই সংস্থার ব্যবসা রয়েছে বাংলাদেশে। তাই তাঁকে মাঝেমধ্যেই বাংলাদেশে আসতে হয়। যদিও পুলিশের দাবি, ওই হোটেলে পিটার হাস নামে কোনও বিদেশি নাগরিক ছিলেন না সেদিন। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার পতনের আন্দোলনে সারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, গণঅভ্যুত্থানের একবছর পূর্তির দিনে সেই হাসনাত আবদুল্লাহ, সারজিস আলম, নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারীদের কক্সবাজারে যাওয়ার ঘটনায় অনেকের মনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।












Discussion about this post