চলতি বছরের এপ্রিলেই বাংলাদেশে এসেছিলেন পাকিস্তানের বিদেশ সচিব আমনা বালুচ। তারপরেই ঢাকা আসার কথা ছিল পাক বিদেশমন্ত্রী ইশাক দারের। তিনি আবার পাকিস্তানের উপ প্রধানমন্ত্রীও বটে। কিন্তু সে সময় পহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলা ও তার পরবর্তী ভারতের অপারেশন সিঁদুর নিয়ে পাকিস্তানে একটা ভয়ানক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। যে কারণে পাক উপ প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক বাংলাদেশ সফর হয়নি। অবশেষে তিনি ঢাকা আসছেন। আগামী ২৩ অগস্ট বাংলাদেশ সফরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী ইসাক দার। সূত্রের খবর, বাংলাদেশে পাক বিদেশমন্ত্রীর এই সফরের দিকে কড়া নজর রাখছে। যদিও এই বিষয়ে নয়া দিল্লি এখনও কোনও বিবৃতি বা মন্তব্য করেনি। কিন্তু আগ বাড়িয়ে পাক বিদেশমন্ত্রীর এই সফর নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ভারতকে কার্যত হুমকিই দিয়ে বসলো। যা নিয়ে কূটনৈতিক মহল বেশ অবাক।
ঘটনা হল গত বছর আগস্ট মাসে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই সে দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভারতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করেছিল। সে সময় ভারত যদিও বাংলাদেশের পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়, কিন্তু গত বছর আগস্টেই ভারত বলেছিল এটা দুদেশের সম্পর্কে কোনও প্রভাব ফেলবে না। বরং আগের মতোই কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার বার্তা দিয়েছিল। কিন্তু ইউনূস সরকার তা রাখতে চায়নি। বিগত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে নানারকম ভারত বিরোধী মন্তব্য এসেছে। কখনও ছাত্র নেতাদের থেকে তো কখনও কট্টরপন্থী মৌলবাদী সংগঠনগুলি থেকে। এমনকি ভারত বিরোধী মন্তব্য করতে ছাড়েননি বাংলাদেশের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য থেকে শুরু করে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসও। তিনি চিনের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতের সেভেন সিস্টার্স নিয়ে হুমকি দিয়েছিলেন। এই সময়কালে ভারত যথেষ্ট সংযম দেখিয়েছে। তবে কয়েকটি কঠোর পদক্ষেপও নিয়েছে। যেমন ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিল থেকে শুরু করে স্থলবন্দরগুলি বন্ধ করে দেওয়া। এতেও বাংলাদেশ সাবধান হয়নি।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ইউনূস সরকার ভারতকে দূরে ঠেলে পাকিস্তানকে আপন করেছে। উল্লেখ্য বাংলাদেশে শেখ হাসিনার জমানায় ইসলামাবাদ এবং ঢাকার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য কোনও উন্নতি হয়নি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয় সাবেক পূর্ব পাকিস্তান, জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের। সেবার ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করেই বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করে। স্বাধীন বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য প্রায় বন্ধই ছিল। যা পুনরায় শুরু হয়েছে ইউনূসের আমলে। এমনকি পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মধ্যে ভিসা সংক্রান্ত বিধিও শিথিল করা হচ্ছে। এবার বাংলাদেশ সফরে আসছেন পাক বিদেশমন্ত্রী তথা উপ প্রধানমন্ত্রী ঈশাক দার। বলা হচ্ছে দুদেশের সম্পর্ক আরও নিবিড় করতেই এই সফর। উল্লেখ্য, ইউনূস সরকার পাকিস্তানের মতো তুরস্ককেও আপন করতে শুরু করেছে। যা ভারতের পক্ষে সহজে মেনে নেওয়া কঠিন। পাক বিদেশমন্ত্রী বৈঠক করবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ও প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে। ইসলামাবাদ এবং ঢাকার মধ্যে এই কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে ভারতে উদ্বেগের বিষয়ে সোমবার প্রশ্ন করা হয়েছিল পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনকে। তিনি জানান, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কেমন হবে, সেটি আমি ডিসাইড করি না। একই ভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কী হবে, সেটি নিশ্চয়ই ভারত ডিসাইড করবে না!
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালে তৎকালীন পাক বিদেশমন্ত্রী হিনা রব্বানি খার বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাতে সে সময় ঢাকা সফর গিয়েছিলেন। এর এক দশক পর কোনও পাক বিদেশমন্ত্রী ঢাকায় আসছেন। জানা যাচ্ছে তিনি কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের সঙ্গেও বৈঠক করবেন। ওয়াকিবহাল মহলের মতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে এই নতুন সম্পর্কের নেপথ্যে রয়েছে জামায়তে ইসলামী বাংলাদেশ রয়েছে। এই কট্টরপন্থী ইসলামিক সংগঠন বরাবরই পাকিস্তানপন্থী। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময়ও জামাত নেতৃত্ব পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন। তাঁরা আল বদর ও আল সামস নামে দুটি শাখা সংগঠন তৈরি করে পাক হানাদার বাহিনীকে সাহায্য করেছিলেন। বহু মুক্তিযোদ্ধা তাঁদের হাতে খুন হন, বহু মহিলা ধর্ষিত হন। এই রাজাকার বাহিনী কোনও সময়ই চায়নি বাংলাদেশ স্বাধীন হোক। আজ ৫৪ বছর পর এসেও জামাত নেতারা চাইছেন বাংলাদেশকে পাকিস্তানে পরিণত করতে। মূলত তাঁদের চাপেই ইউনূস প্রশাসন ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার জন্য এগিয়েছে। সেটা ভারত জানে। তাই গোটা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে ভারত।












Discussion about this post