গত বছর ৫ আগস্ট সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের উদ্যোগে বঙ্গভবনে এক বৈঠকের পর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসের নাম ঘোষণা করেছিলেন। তার পর পরই আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা মন্তব্য করেছিলেন, “আমাদের ক্ষমতায় থাকাকালীন আমরা ইউনূসকে যা বলেছি বা করেছি তা ভিন্ন বিষয়। তবে এই মুহূর্তে তিনিই বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি। এখন তাঁর জনপ্রিয়তা ৯০ শতাংশের কাছাকাছি”। সেই সময়কার বাংলাদেশের সিংহভাগ নাগরিকই বিশ্বাস করতেন, শেখ হাসিনার হঠাৎ দেশ ত্যাগের পর মুহাম্মদ ইউনূসই বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য একমাত্র সঠিক ব্যক্তি। এমনকি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যখন দ্রুত অবনতি হচ্ছিল, একের পর এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটছিল, বা মবের নামে ব্যাপক লুটতরাজ, খুন, ডাকাতি চলছিল, তখনও মানুষ সেনাপ্রধান এবং মুহাম্মদ ইউনূসের উপর আস্থা রেখেছিলেন। এমনকি অনেকে বিশ্বাস করেছিলেন যে ইউনূস ফিরে এলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। এটা গত বছরের ৫ থেকে ৮-৯ আগস্টের চিত্র। তবে, এই বিপুল সমর্থন সত্ত্বেও, জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র কিন্তু প্রভাবশালী অংশ, যাদের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা হলেও সচেতনতা ছিল তাঁরা ইউনূস আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের আগেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
প্যারিসে থাকাকালীনই গণমাধ্যমকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারের মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, “যদি বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে ভারতের সেভেন সিস্টার্সও স্থিতিশীল থাকবে না”। যদিও প্যারিস বিমানবন্দরে ঢোকার মুখে তিনি জানিয়েছিলেন আমি বাংলাদেশে যাচ্ছি, দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে। আশা করছি সব সমস্যার সমাধান করতে পারবো।
যদিও মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের ক্ষমতা হাতে নিয়েছেন এক বছর হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যেই তিনি ভারতের সেভেন সিস্টার্স বা উত্তরপূর্বের সাতটি রাজ্যকে নিয়ে বারংবার হুমকি দিয়েছেন। যা নিয়ে বাংলাদেশের প্রাক্তন এবং বর্তমান কূটনৈতিকরাও বিস্মিত ও হতবাক। তাঁরা আড়ালে আবডালে এই প্রশ্ন তুলছেন, কেন ইউনূসের মতো শিক্ষিত ব্যক্তি আমাদের বৃহত্তম প্রতিবেশী দেশ সম্পর্কে এমন বিবৃতি দিচ্ছেন?ইউনূসের ভারত বিরোধিতার যেখানে অন্য দেশের মোট সীমান্তের মাত্র ২০৭ কিলোমিটার অংশ অন্য দেশের সঙ্গে ভাগ হয়? কেউ কেউ এমন দাবিও করছেন, ভারত তাঁর চিহ্নিত শত্রু শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তে ইউনূস সাহেব গভীরভাবে ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং এই ক্রোধই তাঁকে এই বিবৃতি দিতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু ইউনূসের ভারত বিরোধিতার এটাই কি একমাত্র কারণ? সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, যত দিন যাচ্ছে, ইউনূসের সেই পাহাড়প্রামান জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা। ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার, তাঁদের দোসর ছাত্রনেতা, কট্টরপন্থী মৌলবাদী সংগঠনগুলি এবং আওয়ামী লীগের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপি প্রবলভাবে চেষ্টা করে চলেছেন, যে কোনও মূল্যে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ থেকে দূরে রাখতে। রীতিমতো অর্ডিন্যান্স জারি করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে দলটির নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী মামলা করে রাজসাক্ষীও জোগার করা হয়েছে। এত কিছুর পরও ঠেকানো যাচ্ছে না আওয়ামী লীগকে। রাজধানী ঢাকা-সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে আওয়ামী লীগের মিছিল, ঝটিকা কর্মসূচি চলছে। আর যেটা খালি চোখে দেখা যাচ্ছে না, সেটা হল শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে বাংলাদেশে। এর বহু লক্ষণ ফুটে উঠছে সে দেশের সাধারণ নাগরিকদের কথাবার্তায়।
বেশ কয়েকজন সিনিয়র কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক দাবি করছেন, শপথ নেওয়ার আগেই মুহাম্মদ ইউনূস জনসংখ্যার একটি অংশের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিলেন। তাদের সংখ্যা যত কমই হোক না কেন – তাদের চিন্তাভাবনা সমাজে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। ওই বিশ্লেষকদের দাবি, ইউনূসের প্রধান কাজ ছিল বাংলাদেশে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দ্রুত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজন করা যা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হবে। যা ২০১৪ সালে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ঘটেনি। কিন্তু ক্ষমতালোভী ইউনূস তা করেননি, বরং নানা আছিলায় নির্বাচন পিছিয়েছেন, দেশে অরাজকতা বাড়তে দিয়েছেন। মুদ্রাস্ফিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায়, দেশে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। আর সর্বপরি একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছেন। এটাই বুমেরাং হয়ে উঠছে মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে, আর আশির্বাদ হয়ে উঠছে শেখ হাসিনার কাছে। কারণ, পাকা রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনা জানেন, কিভাবে ফিনিক্স পাখির মতো ফিরে আসা যায়।












Discussion about this post