সেই ভয়ঙ্কর এক রাতে শেষ হয়ে গিয়েছিল গোটা রাজপরিবার। ২০০১ সালের ১ জুন গোটা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেওয়া এক রাজকীয় গণহত্যায় রক্তাক্ত হয়েছিল নেপালের রাজপরিবার। ২২ বছরেও সেই ঘটনার রহস্যের সমাধান হয়নি, কিন্তু তার মধ্যেই নেপালে ঘটে গেল আরও এক দূনিয়া কাঁপানো ঘটনা। আজ থেকে ২২ বছর আগে নেপালের রাজপ্রাসাদে চলছিল জমজমাট নৈশভোজের পার্টি। সেই উপলক্ষ্যে নেপালের কাঠমাণ্ডুর নারায়ণহিতি দরবারের বিলিয়ার্ড রুমে জড়ো হয়েছিলেন রাজপরিবারের সদস্যরা। সেখানেই আচমকা চলে এলপাথাড়ি গুলি। গরম বুলেটে মুহূর্তে ঝাঁঝরা হয়ে যান নেপালের তৎকালীন রাজা বীরেন্দ্র-সহ রানী ও পুত্র। সেই সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছিলেন রাজার ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, বোন ও বোনের স্বামী। প্রায় গোটা রাজপরিবার শেষ। রাজপুরী একমুহূর্তের মধ্যে হয়ে উঠেছিল মৃত্যুপরীতে। অভিযোগ, সেদিন নাকি গুলি চালিয়েছিলেন রাজা বীরেন্দ্রর বড় ছেলে অর্থাৎ যুবরাজ দীপেন্দ্র। যদিও নেপালের বহু সংবাদ সংস্থা এমনকি, রাজপরিবার অনেকেই সেই তত্ত্ব মেনে নিতে পারেননি। বরং একটা বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব খাড়া করেছিলেন তাঁরা। জানা যায়, চিনের ষড়যন্ত্রেই সেবার নেপালের রাজপরিবার খতম হয়েছিল। সেই ষড়যন্ত্রে ভারতপন্থী রাজপরিবারকে খতম করে গণতন্ত্র্রের বীজ বুনে দেওয়া হয়েছিল নেপালে।
বাবা-মা-ভাই ছাড়াও রাজপরিবারের একাধিক সদস্যকে হত্যা করে যুবরাজ দীপেন্দ্র নিজেকেও গুলি করেছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি কোমায় চলে যান। সেই অবস্থাতেই তাঁকে রাজা ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু কয়েকদিনের মাথায় তাঁর মৃত্যু হয়। সরকারি তদন্তে যদিও এই রাজকীয় গণহত্যার সাথে যুবরাজ দীপেন্দ্রর জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছিল। বলা হয় এক ভারতীয় কন্যার প্রেমেই তিনি এমন কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। ওই তরুণী ছিলেন নেপালি রাজনীতিবিদ পশুপতি শমসের জং বাহাদুর রানা এবং গোয়ালিয়রের রাজপরিবারের সদস্য ঊষা রাজে সিন্ধিয়ার কন্যা দেবযানী। গোয়ালিয়রের পূর্বতন রাজা প্রয়াত মাধবরাও সিন্ধিয়া এবং বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া যথাক্রমে তার মামা এবং পিসি। জানা যায়, যুবরাজের সঙ্গে এই সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি নেপালের রাণী তথা দীপেন্দ্র মা ঐশ্বর্যা। দীপেন্দ্রর বিরুদ্ধে রাজপরিবারে হত্যাকাণ্ড চালানোর অভিযোগ ওঠার পর দেবযানী সংবাদসংস্থাকে বলেছিলেন, দীপেন্দ্র সে দিন মত্ত অবস্থায় ছিলেন। এমনকি, রাজবাড়িতে তাঁর নিজের ঘরের ফোন নম্বর থেকে তিন বার ফোনও করেছিলেন তাঁকে। কিন্তু মদ্যপান করায় ঠিক করে কথাই বলতে পারছিলেন না দীপেন্দ্র। এই বয়ানের পর ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব আরও জোরালো হয়। প্রশ্ন উঠছিল, যিনি মত্ত অবস্থায় কথাই বলতে পারছিলেন না, তিনি সঠিক লক্ষ্যে বন্দুক চালিয়ে বেছে বেছে নিজের পরিবারের সবাইকে হত্যা করলেন কী ভাবে?
এই ঘটনার পর নেপালের রাজা হিসেবে অভিষেক হয় বীরেন্দ্রর ভাই জ্ঞানেন্দ্র। সেদিন রাজ দরবারে তিনি উপস্থিত না থাকলেও তাঁর পরিবারের লোকজন ছিলেন। জ্ঞানেন্দ্রের স্ত্রীরও গুলি লেগেছিল সেদিন, তবে গুরুতর কিছু হয়নি। পরেই শুরু হয় নেপালের রাজপরিবারের বিরুদ্ধে নেপালের জনগণের বিক্ষোভ। সম্ভবত নেপালের রাজতন্ত্রের শেষের সেটাই শুরু। এমনকি নেপালের জনতা রাজপরিবারকে ১৫ দিন সময় দেয় রাজপ্রাসাদ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য। কেন রাজপরিবারের এমন দুরবস্থা হল? সেই নিয়ে একাধিক তত্ত্ব ও দাবি থাকলেও নেপাল রাজপরিবারের একটি প্রাচীন অভিসাপ নিয়ে আজও আলোচনা হয়।
নেপালের প্রাচীন ইতিহাস তুলে ধরে এই ঘটনাকে একটি ‘পুরনো অভিশাপের ফল’ বলা হয়েছে। প্রাচীন কাহিনি অনুযায়ী এক সন্ন্যাসী নাকি নেপালের রাজা পৃথ্বীনারায়ণ শাহকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। তিনটি রাজ্য জয় করে ফেরার পর বীর রাজা পৃথ্বীনারায়ণের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন এক সন্নাসী। সেদিন রাজা ওই সন্নাসীকে খাতির করে কিছু খেতে দিয়েছিলেন। ওই সন্নাসী কিছুটা খেয়ে বাকিটা রাজার হাতে দিয়ে বলেছিলেন “খেয়ে নাও, এটা প্রসাদ”। সন্ন্যাসীর কথায় তিনি ক্ষুব্ধ হন অহংকারী রাজা। খাবারটি মাটিতে ছুড়ে ফেলে তিনি বলেছিলেন, “তিনি এঁটো খাবেন না”। কথিত আছে, সেই সময় সন্ন্যাসী তাঁকে অভিসাপ দিয়ে বলেছিলেন, ১০ পুরুষ পর রাজার রাজত্ব শেষ হয়ে যাবে। নেপালের রাজা বীরেন্দ্র ছিলেন সেই পৃথ্বী শাহের একাদশতম বংশধর। ফলে বীরেন্দ্রর পর তাঁরা ভাই জ্ঞানেন্দ্র রাজা হলেও সেই রাজত্ব আর টেকেনি। এরপরই নেপালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়। পুরোনো গল্পগাথা যাই হোক না কেন, সম্প্রতি নেপালে আবার রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবি উঠছে।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post