বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানেরর জেরে সরকার রাজনৈতিক পালাবদলের এক বছর পর প্রথম কোনও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সংসদ বা ডাকসু নির্বাচন, এরপর হয়ে গেল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ বা জাকসু-র নির্বাচন। এরপর হবে রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দাবি করছেন, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের যে প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, এই ছাত্রভোট তারই রিহার্সাল। আবার জাতীয় নির্বাচনের আগে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি পরখের জন্য রাজনৈতিক দলগুলির কাছে এই ছাত্রভোট সেমি ফাইনালও বটে। তাই এই ভোটগুলি খুব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলির কাছে। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যারা ভোট দিচ্ছেন তাঁরাই আবার ভোট দেবেন জাতীয় নির্বাচনে। ফলে ট্রেন্ড কোন দিকে যাচ্ছে, সেটা বোঝা যাবে ডাকসু, জাকসু-র মতো বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল দেখলে।
ডাকসুতে সকলকে অবাক করে জামায়তে ইসলামী বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির অভূতপূর্ব ফল করেছে। তাঁরা কয়েক কদম পিছনে ফেলেছে বিএনপির ছাত্রদল এবং এনসিপি সমর্থিত বাগছাসকে। অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার হয়ে যাওয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বা জাকসু নির্বাচনের দিনও দেখা গেল জামাতের দাপাদাপি। আর তা দেখে একাধিক অভিযোগ তুলে নির্বাচন শুরুর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই নির্বাচন বয়কট করল ছাত্রদল-সহ আরও কয়েকটি সংসগঠন। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামাতের রমরমা শুরু হয়ে গিয়েছে। যা বাংলাদেসের স্বাধীনতার পর থেকে বিগত ৫৪ বছরেও ছিল না। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হিসেবে পরিচিত জামাত গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে নিজেদের শক্তি ও সংগঠন বাংলাদেশের মাটিতে অত্যন্ত শক্তপোক্ত করে ফেলেছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল।
বহু প্রতীক্ষিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছিল ৭৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্য়ালয়ে মোট ভোটার সংখ্যা নেহাত কম নয়, জানা যায় মোট ভোটার সংখ্যা ৩৯ হাজার ৮৭৪ জন। এর মধ্যে পাঁচটি ছাত্রী হলে ১৮ হাজার ৯৫৯ জন আর ১৩টি ছাত্র হলে ভোটার রয়েছেন ২০ হাজার ৯১৫ জন। ডাকসুতে ২৮টি পদের বিপরীতে ৪৭১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা মাত্র ৬২ জন। অপরদিকে জাকসু নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ ৩৩ বছর পর হওয়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ১১ হাজার ৭৪৩ জন। এর মধ্যে ছাত্রী ৫ হাজার ৭৪২ জন। আশ্চর্যজনকভাবে এই নির্বাচনে প্রায় ৩৯ শতাংশ ছাত্রী ভোটই দেননি বলে জানা যাচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণে অসংগতির নানা অভিযোগ তুলে জাকসু নির্বাচন বর্জন করছে বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল। নেতৃত্বের দাবি, আঙুলে দেওয়া কালি মুছে যাওয়া, ব্যালট পেপার ফ্লোরে ছড়িয়ে থাকা এবং মব সৃষ্টি করে ভোট চুরির করা। কিন্তু এই দাবিগুলির মধ্যে যে দাবিটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সেটা হল, জামাত ঘণিষ্টের সংস্থাকে দিয়েই নাকি ব্যালট পেপার ছাপিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বাইট – (টিসি 00.13 – 01.42) https://www.youtube.com/watch?v=W4y2Yq4gV2c
প্রশ্ন উঠছে, জাকসু নির্বাচনে ব্যালট পেপার ছাপলো কে? ছাত্রদল–সমর্থিত প্যানেলের সাধারণ সাধারণ সম্পাদক বা জিএস পদপ্রার্থী তানজিলা হোসাইন বৈশাখী প্রশ্ন তুলেছেন, জামায়ত নেতার কোম্পানি থেকে ছাপানো ব্যালট শতকরা ১০ থেকে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত ব্যালট ছাত্রশিবিবের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে কি না? তাঁর আরও দাবি, বিভিন্ন হলে ভোট চলাকালীন আমাদের প্রার্থী ও এজেন্টদের ঢুকতে বাঁধা দেওয়া হয়েছিল। এখানেই আমাদের প্রশ্ন, ওই হলগুলিতে জাল ব্যালট দিয়ে ভোট দেওয়া হচ্ছিল কি না? এসব দেখে মনে হচ্ছে টোটাল ভোট ইজ্ঞিনিয়ারিং হয়েছে জাকসু নির্বাচনে। এটা পুরোপুরি কারচুপির নির্বাচন, প্রহসনের নির্বাচন।
মজার বিষয় হল, ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেল সমন্বিত শিক্ষার্থী জোটের ভিপি) প্রার্থী আরিফ উল্লাহ দাবি করেছেন, আমরা গতকাল বুধবার থেকে দেখতে পেয়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন কমিশন ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১০ শতাংশ অতিরিক্ত ব্যলট পেপার ছাপিয়েছে, এর বিরুদ্ধে আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম।
বাইট – আরিফ উল্লাহ-ছাত্রশিবির (টিসি 00.35 – 01.22)
জানা যাচ্ছে, জাকসুর নির্বাচনে ওএমআর এবং ব্যালট পেপার ছাপিয়েছে এইচআর সফট বিডি নামে একটি সংস্থা। ছাত্রশিবির নেতৃত্বের দাবি, এই সংস্থার নির্বাহী কর্মকর্তা রোকমুনূর রহমান রনি একজন বিএনপি সমর্থক। অথচ এই নিয়ে ছাত্রশিবিবরের নামেই মিথ্যাচার করা হচ্ছে। অর্থাৎ, ব্যালট পেপার নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি নিশ্চিত করে কোন সংস্থার থেকে তাঁরা ব্যালট ছাপিয়েছিলেন তাহলেই বিতর্ক কমবে। কিন্তু রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি এবং জামাতি ভাবধারা প্রচারে শিবিরের ‘সুসংগঠিত পরিকল্পনা’ কাজ করেছে। যা আগামীদিনে বিএনপি এবং এনসিপিকে চাপে রাখবে।












Discussion about this post