‘রূপায়ণ টাওয়ারের বাসিন্দা’! ঢাকার রাস্তা, যে কোনও গলি, তস্য গলি যদি আপনি ঘুরে বেরান, তাহলে সাধারণ মানুষের মুখে প্রায়ই শুনতে পাবেন এই উপমাটি। মূলত, কোনও অসৎ বা চালবাজ লোককে বোঝাতে কাউকে ‘রূপায়ণ টাওয়ারের বাসিন্দা’ বলে কটাক্ষ করছেন ঢাকাবাসী। কেন এই উপমা, এর মানে কি অথবা কাকে বা কাদের উদ্দেশ্য করে এই উপমা সৃষ্টি হল? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে লোকজন গলার স্বর নামিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে শোনাচ্ছেন, পাঁচতারা হোটেলে তিন হাজার অতিথিকে ন’হাজার টাকার প্লেটে ইফতার করানোর গল্প। এবার বুঝে নিন, কাঁদের বলা হচ্ছে, ‘রূপায়ণ টাওয়ারের বাসিন্দা’! আসলে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র শাহবাগ মোড়ের কাছে বাংলা মোটর এলাকায় সুবিশাল অট্টালিকার নাম রূপায়ণ টাওয়ার। আর সেখানেই ঝাঁ চকচকে সুবিশাল প্রধান কার্যালয় বাংলাদেশে কোটা-বিরোধী আন্দোলনের ‘জনক’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের। আবার সেখানেই আরেকটি আলাদা সদর দফতর আছে ওই ছাত্রদেরই নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির।
ঢাকার অভিজাত এলাকায় একই গগনচুম্বী অট্টালিকায় ছাত্রদের দুই সদ্যজাত সংগঠনের বিশাল বিশাল অফিস। তাঁর ভাড়া কত, কিভাবে আসছে এত টাকা, এই সমস্ত প্রশ্নের কোনও জবাব আজ পর্যন্ত পায়নি সাধারণ মানুষ। মজার বিষয় হল, এই উত্তর খুঁজতে গিয়ে ঢাকার বহু সাংবাদিকের প্রাণ সংশয় হয়েছে বলে জানা যায়। তবে এক সময় টিউশন করা সেই ছাত্রদের যে বিলাসবহুল জীবনযাপণ এবং চালচলন সেটা নিয়েও বহু প্রশ্ন সাধারণ মানুষের। এমনকি বিকল্প ধারার রাজনীতির কথা বলা সেই ছাত্রনেতারা বরাবর জবাব এড়িয়ে গিয়েছেন এই সমস্ত প্রশ্নের। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটা অংশের দাবি, এই টাকা ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব পেয়েছে মার্কিন ডিপ স্টেট এবং কিছু এনজিও মারফৎ। আবার কেউ কেউ দাবি করেন, এই টাকা জোগায় দেশীয় ব্যবসায়ীদের একটা অংশ। কেউ স্বেচ্ছায় নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি করার উদ্দেশ্যে। আবার কেউ কেউ দেন, ব্যবসা টিকিয়ে রাথতে। সেই সঙ্গে আছে বিস্তর চাঁদাবাজি এবং তোলাবাজির অভিযোগ। কেউ কেউ বলেন, এ সব থেকেও বিপুল অর্থ ওঠে।
তবে ব্যবসায়ীরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন এটা ব্যাড ইনভেস্টমেন্ট হয়ে গিয়েছে। আর বুঝতে পারছে এনসিপি নেতৃত্বই। আপনারা খেয়াল করে দেখবেন, বিগত এক মাসে এনসিপি নেতাদের খুব একটা খবরের শিরোনামে আসতে দেখা যায়নি। যেখানে, নাহিদ, সারজিস, হাসনাতদের প্রায়ই টেলিভিশনের ক্যামেরায় বক্তব্য দিতে দেখা যেত। বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘ছাত্ররা এখন অনুধাবন করছেন যে তাঁদের ব্যবহার করা হয়েছে। এখন ছুঁড়ে ফেলার তোড়জোড় চলছে। কেউ কেউ বলছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদেরই অনেকে বলছেন, নোটের ফোয়ারায় গোসল করিয়ে এ বার কফিনে ভরে দাফন করার পালা। গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পরে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম একটা মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর কথায়, ‘খুবই ডিফিকাল্টির মধ্যে আছি আমরা’।
এই ভিডিওতেই দেখা যাচ্ছে প্রত্যেকের মুখই শুকনো, যেখানে কয়েকদিন আগেই তাঁদের হম্বিতম্বিতে অস্থির হতো গোটা বাংলাদেশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, এই ডিফিকাল্টির কারণ হল সংস্কার নিয়ে বছরভর ভারী ভারী আলেচনা, যে সংস্কার পর্ব শেষ হওয়াকে নির্বাচনের প্রধান শর্ত বলে ঘোষণা করেছিলেন অন্তবর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস, তা মাঝপথেই ফেলে দিয়ে এখন তিনি নির্বাচনের দামামা বাজাচ্ছেন। অনেকেই দাবি করছেন, বাংলাদেশে ৩০০ আসনের মধ্যে একটিতেও এই ছাত্রনেতাদের কেউ জেতার যোগ্য নয়, জিতবেও না। এমনকি কারও কারও জামানত জব্দ হলেও অবাক হবেন না কেউ। নাহিদ, সারজিস, হাসনাত প্রত্যেকেই এখন আতঙ্কিত। জামাত এখন তাঁদের পাত্তা দিচ্ছে না। বিএনপিও তাঁদের দলে নেবে না। ফলে এনসিপির ভবিষ্যত অন্ধকার বুঝে অনেকেই তলে তলে অন্য রাজনৈতিক দলে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু ঠাঁই হচ্ছে না কারও। অন্যদিকে ‘ইউনূস সরকারের শিরদাঁড়া’বলে পরিচিত মাহফুজ আলমও ভাগলবা হওয়ার পরিকল্পনা করছে বলে সূত্রের খবর। এনিসপি-র ডিফিকাল্টি বাড়িয়ে মাহফুজ় গত শনিবার একটি ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতির পরিমণ্ডলে আমাদের আরও একটা প্রক্সি-মওদুদীপন্থী দলের প্রয়োজন নেই। ইতিমধ্যেই আধ ডজন আছে, নতুন কিছু আপনি যোগ করতে পারবেন না!’ এই মওদুদী হলেন জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা। অর্থাৎ তিনি বুঝিয়ে দিলেন, জমাতের ধামাধরা দলের আর প্রয়োজন নেই। এনসিপি-কে ‘ছদ্ম জামায়াতি’ আখ্যা দিয়ে মাহফুজ বিএনপি-তে যোগ দিতে চাইছেন বলে মনে করছেন অনেকে। সে ক্ষেত্রে সংসদে তাঁর একটা আসন পাকা হতে পারে। ফলে ঢাকার লক্ষণ ভালো নয়!যে কোনও মুহূর্তে আরেকটা অভ্যুত্থান ঘটে গেলেও ঘটে যেতে পারে।












Discussion about this post