বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ির পরিস্থিতি এখনও থমথমে, গোটা উপজেলাজুড়ে জারি রয়েছে ১৪৪ ধারা। রবিবার এক জাতিগত সংঘর্ষে সেখানে তিন জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছিলেন। জানা যাচ্ছে নিহত ব্যক্তিরা স্থানীয় আদিবাসী মারমা সম্প্রদায়ের সদস্য। এই ধারাবাহিক অশান্তির ঘটনা আসলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ বাঙালি ও পাহাড়িয়াদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বলেই দাবি করা হচ্ছে। যা সামাল দিতে গিয়ে অন্তত ১৩ জন সেনাসদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। এমনকি কয়েকটি থানার আধিকারিকরাও আহত হয়েছেন। উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের পাহাড়িয়া বলা হয়ে থাকে। পাশাপাশি সেখানে বাঙালি সম্প্রদায়ের মানুষজনও বসবাস করেন। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মাঝেমধ্যেই বিরোধ বাঁধে। এই ধরণের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে বাঙালিদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজোর মুখে এই ঘটনা যথেষ্টই চিন্তায় রেখেছে অন্তর্বর্তী সরকারকে।
যদিও সাম্প্রতিক ঘটনার জন্য একতরফাভাবে পাহাড়িয়াদের দায়ী করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বাংলাদেশ সেনার দাবি, পাহাড়িয়াদের সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ এবং তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলি দীঘিনালা ও রাঙামাটিতে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের স্বার্থে তৈরি সংগঠন গ্লোবাল অ্যাসোসিয়েশন ফর ইন্ডেজিনিয়াস পিপলস অফ দ্য চিটাগং হিল ট্রাকটস আবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকেই কাঠগড়ায় তুলছে। এই সংগঠন ঢাকায় অবস্থিত পশ্চিমা কূটনৈতিক মিশনগুলিকে অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে তাঁরা চট্টগ্রামের পাহাড়ে বাংলাদেশ সেনার গণহত্যার ঘটনার তদন্তে প্রতিনিধি দল পাঠায়। এই সংগঠনটির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ১৫টি আদিবাসী পরিবারের বাড়ি এবং ৬০টি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বহু দোকানপাট লুট করা হয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, রবিবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা অন্তত চারজন আদিবাসীকে গুলি করে হত্যা করেছে। অন্তত ৪০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তাঁদের আরও দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামে বহিরাগত মুসলিমরা এসে ঘাঁটি গেড়েছে। বাংলাদেশ সেনার এই হামলার সুযোগে, ওই সম্প্রদায়ের মানুষজন খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা এলাকায় আদিবাসীদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, লুটপাট চালিয়েছে। পাশাপাশি এই অবৈধ মুসলিম বসতির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বলেও দাবি করেছে এই সংগঠন।
ঘটনা হল, মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় আসার পরই পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে রোহিঙ্গা মুসলিমদের কয়েকটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি হয়েছে। সেখানে তাঁদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই এবং পাকিস্তান আর্মির সদস্যরা। এই মুসলিম বসতিগুলি থেকে মাঝেমধ্যেই লুটপাট চালানো হয় বলে অভিযোগ। যা নিয়ে কয়েক মাস ধরে প্রতিবাদ জানাচ্ছিল পাহারিয়া ও বাঙালিদের সংগঠনগুলি। এর থেকে মুখ ঘোরাতেই এই দাঙ্গার পরিবেশ সৃষ্টি করা হল বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং সেনাবাহিনী এই হিংসার পিছনে দেশি-বিদেশি ব্লগারদের প্ররোচণাকে দায়ী করা হচ্ছে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গির আলম চৌধুরী সোমবার জানান, একটি মহল খাগড়াছড়ি পরিস্তিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। তাঁর সরাসরি অভিযোগ ভারতের দিকে।
অপরদিকে বাংলাদেশ সেনার তরফে দাবি করা হয়েছে, ১৯ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খাগড়াছড়ি ও গুইমারা এলাকায় বিভিন্ন ঘটনাকে পুঁজি করে আইনের আশ্রয় না নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলকে অস্থিতিশীল এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটনের বিষয়টি একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে বিভিন্ন প্রমাণ আছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের বক্তব্য, ভারত পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করে এই এলাকা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে। যদিও এই বিষয়ে ভারতের তরফে এখনও কোনও মন্তব্য বা বিবৃতি দেওয়া হয়নি।












Discussion about this post