এই রাজ্যে ভোটার তালিকায় নিবিড় সমীক্ষা বা এসআইআর হবেই এটা মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। এসআইআর-এর কাজ খতিয়ে দেখতে ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ ভারতীর নেতৃত্বে বাংলায় এসেছিল নির্বাচন কমিশনের বিশেষ টিম। তাঁরা দক্ষিণবঙ্গের সব জেলাশাসক, অতিরিক্ত জেলাশাসক ও অনান্য প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকও করেন। সেইমতো নির্দেশ দিয়ে যান, আগামী ১৫ অক্টবরের মধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি সেরে রাখতে হবে। অর্থাৎ এর পরই এসআইআর নিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের দল রাজ্য ছাড়ার ২৪ ঘন্টার মধ্যেই এসআইআর নিয়ে কার্যত গর্জে উঠলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্যের প্রধান প্রশাসনিক ভবন নবান্নের 14 তলায় বসে পেছনে জাতীয় পতাকা রেখে রাজ্যে সাংবিধানিক প্রধান হিসাবে তিনি যে যে অভিযোগ তুললেন তা কার্যত অসাংবিধানিক বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল। মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর আগেও রাজ্য সরকারের কর্মচারী ও আধিকারিকদের হুমকি দিয়েছিলেন এসআইআর ইসুতে। বোলপুরের প্রশাসনিক সভা থেকে তিনি বলেছিলেন মনে রাখবেন ভোট মিটলে আপনারা রাজ্য সরকারের অধীনেই কাজ করবেন।
বৃহস্পতিবার নবান্ন থেকে সাংবাদিক সম্মেলন করলেন মুখ্যমন্ত্রী। এবারও তিনি কার্যত হুমকি দিলেন একদা রাজ্য সরকারের শীর্ষ পদে বসা এক সিনিয়র আইএএস আধিকারিককে। বর্তমানে যিনি রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বা সিইও অর্থাৎ তিনি এখন সরাসরি নির্বাচন কমিশনের অধীনস্থ অফিসার। মনোজ আগরওয়াল একসময় রাজ্য সরকারের কারিগরি শিক্ষা খাদ্য পর্যটনের মতো বিভিন্ন দফতরের সচিব ও অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। তাকেই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক হিসাবে সুপারিশ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ এস আই আর নিয়ে তিনি যখন তৎপরতা বাড়িয়েছেন, তখন তাকেই একহাত নিলেন মুখ্যমন্ত্রী। ওই সিনিয়র আইএএস অফিসারের বিরুদ্ধেই তুললেন দুর্নীতির অভিযোগ। বললেন আমার কাছে সব প্রমাণ আছে সময় হলে ফাঁস করে দেব।
এসআইআর নিয়ে কার্যত তাঁর গায়ে জ্বালা ধরেছে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভিন্ন সময়ে মন্তব্য শুনে অন্তত এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল। একুশে জুলাইয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন এ রাজ্যে তিনি এসআইআর হতে দেবেন না প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করা হবে। এদিন বললেন “আগুন নিয়ে খেলবেন না”। পাশাপাশি তার দাবি, একদিকে গোটা বাংলায় দুর্যোগ চলছে। মানুষের দুর্ভোগ চলছে। সামনে আবার কালীপুজো, ছটপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো রয়েছে। এবং চারদিকে ডুবে আছে। সেখানে ফিল্ড সার্ভের নাম করে তিনটে অফিসে বসে চারজন অফিসার বিএলও-দের ডেকে থ্রেট করছেন, বলছেন তাঁদের ইচ্ছামতো কাগজ তৈরি করতে হবে।
আমরা দেখেছিলাম এর আগে তিনি নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অমান্য করার চেষ্টা করেছিলেন। নির্বাচনী কাজে কারচুপির দায়ে তিনজন আধিকারিকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল কমিশন। কিন্তু নবান্ন সেই নির্দেশ মানতে গড়িমসি করে। পরে অবশ্য কমিশনের চাপে ওই তিনজনকে সাসপেন্ড করে রাজ্য সরকার। এবার তিনি সরাসরি রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে হুমকি দিলেন, তাও মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসে। এখন দেখার এটা নিয়ে জাতীয় নির্বাচন কমিশন কোন মন্তব্য করে কি না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পাশাপাশি বিরোধী দল বিজেপির নেতৃত্বের দাবি এই রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একেবারেই ভেঙে পড়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেশের আইন মানছেন না এমনকি দেশের সাংবিধানিক সংস্থা গুলিকেও মানতে নারাজ। তাই অবিলম্বে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে ভোট করানোর প্রয়োজন। সম্প্রতি উত্তরবঙ্গের নাগরাকাটায় বিজেপির সাংসদ খগেন মুর্ম ও বিধায়ক শংকর ঘোষের ওপর হামলার ঘটনায় কেন্দ্রীয় সরকার কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না এই প্রশ্নও ঘুরতে শুরু করে বিজেপির নিচে তলার কর্মীদের মধ্যে। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন, এই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার মত পরিস্থিতি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই সেই রাস্তা পরিষ্কার করে তুলছেন। যেভাবে তিনি প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছেন তাতে যদি কোন প্রকার নির্বাচন কমিশনের কাজে বাধা আসে বা এসআইআর প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় তাহলেই কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে ৩৫৫ বা ৩৫৬ ধারা জারি করার পথ প্রশস্ত হয়ে যাবে। অর্থাৎ বাঁশ কেন ঝাড়ে, এসো আমার ঘরে।












Discussion about this post