পূর্ব ভূমধ্যসাগর এবং দক্ষিণ ককেশাসে ভারত দৃঢ়ভাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে। যা তুরস্কের আঞ্চলিক প্রভাবের বিরুদ্ধে কৌশলগত অবস্থান বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। আরও তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, অপারেশন সিঁদুরের পর এই পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে নয়া দিল্লি। উল্লেখ্য, তুর্কি অপারেশন সিঁদুরের সময় পাকিস্তানের সমর্থনে করাচিতে একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছিল। এর পর থেকেই ভারতীয় নৌবাহিনী কড়া অবস্থান নিতে শুরু করেছে। ভারতীয় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলি তুরস্কের কাছাকাছি জলসীমায় প্রায় অবিচল উপস্থিতি বজায় রেখে চলছে, যা ভারতের একটি অভূতপূর্ব সামুদ্রিক কৌশল দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, তুরস্ক বহুদিন আগে থেকেই ভারতের বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ করছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান জাতিসংঘে বারবার কাশ্মীরের উল্লেখ করে ভারতকে বেকায়দায় ফেলতে চেয়েছেন। আবার সেই ১৯৭১ ভারত-পাক যুদ্ধ, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্ম হয় সেই যুদ্ধেও তুর্কি পাকিস্তানকে ব্যাপক সহায়তা দিয়েছিলো। এবারও অপারেশন সিঁদুরের আগে ও পরে তুর্কি পাকিস্তানকে সামরিক সাহায্য দিয়েছে। সেই তুর্কির এবার নজর পড়েছে বাংলাদেশের দিকে। মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে বাংলাদেশ যেভাবে ভারতের বিরুদ্ধে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতে চাইছে, তার অঙ্গ হিসেবে তিনি তুর্কিকে বাংলাদেশে ডেকে এনেছেন বন্ধু হিসেবে। আমরা জানি, তুর্কি বাংলাদেশে সমরাষ্ট্র তৈরির কারখানা খুলতে ইতিমধ্যেই চুক্তি করেছে। সেই মোতাবেক জমি অধিগ্রহণও করতে শুরু করেছে ইউনূস সরকার। যেখানে নাকি অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও ড্রোন তৈরী হবে। এ নিয়ে দুই দেশের একাধিক বৈঠক হয়েছে। এবার জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা বিডা তুর্কির শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলির সঙ্গে আলোচনায় বসেছে ইস্তাম্বুলের এক পাঁচতারা হোটেলে। ‘গেটওয়ে টু গ্রোথ: ইনভেস্ট ইন বাংলাদেশ’ নামে সেই সেমিনারে ৩০টিরও বেশি তুর্কি কোম্পানি অংশ নেয়, যারা ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছে বা নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের যা পরিস্থিতি, তাতে বিশ্বের সিংহভাগ দেশ যেখানে বিনিয়োগ করতে অস্বীকার করছে বা আগের বিনিয়োগ স্থগিত রেখেছে, সেখানে তুর্কির এত আগ্রহ কেন?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পিছনে রয়েছে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের গভীর চাল। তিনি যেমন ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের মাটি ব্যবহারের লাইসেন্স পেয়ে গিয়েছেন, তেমনই বাংলাদেশকেও চাইছেন সেই কাজে। যাতে ভারতের দুই প্রান্ত দিয়েই ভারতকে ব্যতিব্যস্ত রাখা যায়। আবার কেউ কেউ দাবি করছেন, পাক সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির যে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতকে আক্রমণের কথা বলেছিলেন, তা তুর্কি ও যুক্তরাষ্ট্রের ডানায় ভর করে। একই ভাবে তুর্কি বাংলাদেশে আধুনিক ড্রোন ও সমরাস্ত্র তৈরি করে ভারতকেই চাপে রাখতে চাইছে। যদিও ভারত কম যায় না, নয়া দিল্লি ইতিমধ্যেই তুর্কির নাকের ডগায় যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে দিয়েছে। আর তাতেই ভয়ে কাঁটা তুর্কির নৌবাহিনী। জানা যাচ্ছে, ১৩ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর ভূমধ্যসাগরের সালামিস নৌ ঘাঁটিতে পরিচালিত গ্রীস-ভারত প্রথম দ্বিপাক্ষিক যৌথ নৌ মহড়ায় ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজ আইএনএস ত্রিকান্ড অংশ নিয়েছে। এই মহড়াগুলির মাধ্যমে ভারত ও গ্রীস দ্বিপাক্ষিক এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করেছে। দুদেশের গণমাধ্যম আরও জানিয়েছে যে নয়াদিল্লি এথেন্সকে তার দীর্ঘ-পাল্লার ভূমি থেকে ভূমি এবং আকাশ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যার পাল্লা ১,০০০-১,৫০০ কিলোমিটার।
গ্রীক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, অত্যাধুনিক অস্ত্র, সেন্সর এবং গোপন প্রযুক্তিতে সজ্জিত, পূর্ব ভূমধ্যসাগরে আইএনএস ত্রিকান্ডের উপস্থিতি তুর্কির কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা গিয়েছে। তুর্কির ক্রমাগত উস্কানি এবং সামুদ্রিক সীমানা পুনর্নির্মাণের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে ভারত সরাসরি গ্রীস এবং সাইপ্রাসের পাশে দাঁড়িয়েছে। তুর্কি যেভাবে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উৎসাহিত এবং সমর্থন করছে, তাতে ভারত চুপ করে বসে থাকবে না। ফলে তুর্কি যেমন ভারতের নাকের ডগায় বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানকে ব্যবহার করে নয়া দিল্লিকে দাঁত-নখ দেখাচ্ছে. তেমনই ভারত তুর্কির শত্রুদেশ গ্রীস ও আর্মেনিয়াকে অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা সিস্টেমস দিয়ে তুর্কিকে চাপে রেখেছে। কারণ ভারতের সামরিক শক্তি ভূমধ্যসাগর এলাকার আঞ্চলিক বিরোধকে অনেকটাই স্থিতিশীল করবে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।












Discussion about this post