গত বছরের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে এক তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের জেরে পতন হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকারের। এরপর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ৮ আগস্ট শপথ নিয়েছিলেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূস। তার পর থেকে ধাপে ধাপে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চলা একাধিক বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়ে ইউনূস সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। যা নয়া দিল্লি খুব একটা সহজভাবে নেয়নি। গত বছরের ডিসেম্বর মাসেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ থেকে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যে ইন্টারনেট সংযোগের জন্য যে প্রকল্পটি ছিল তা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ভারতও ধীরে ধীরে ওই প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে। এবং বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা করেছে নয়া দিল্লি।
প্রসঙ্গত, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিকম কোম্পানি ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেড বা বিএসএনএল বাংলাদেশ থেকে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ আমদানি করতো। মূলত উত্তর পূর্বের সাতটি রাজ্যে বা সেভেন সিস্টার্সে ইন্টারনেট পরিষেবা দেওয়ার জন্যই ভারত ইন্টারনেট ব্যান্ডইউথ কিনতো বাংলাদেশ থেকে। এবার সেই ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ আমদানি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। জানা যাচ্ছে, ২১ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে বাংলাদেশ থেকে আসা অবশিষ্ট ১০ Gbps ব্যান্ডউইথ লিঙ্কটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে বিএসএনএল। ভারতের প্রযুক্তিবিদদের মতে, এটা ভারতের জন্য এক নবযুগের সূচনা। কারণ, এবার থেকে আর অন্য কোনও দেশ নয়, ইন্টারনেট পরিষেবাতেও আত্মনির্ভর হল ভারত।
মূলত সমুদ্রের তলায় পাতা বিশাল বিশাল কেবলের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যান্ডইউথ আসে। সমুদ্রতীরবর্তী বিভিন্ন দেশ সৈকতের কোনও এক সুবিধাজনক জায়গায় ইন্টারনেট কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন তৈরি করে এর মাধ্যমে সেই দেশে ইন্টারনেট পরিষেবা বজায় রাখে। ভারতে এরকম ১৭টি ইন্টারনেট কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে। যেমন মুম্বই, চেন্নাই, কোচি, থুথুকোডি, তিরুবন্তপুরম, বিশাখাপত্তনম ও দিঘা। কিন্তু উত্তর পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের ধারে কাছে সমুদ্র না থাকা এবং মাঝে বাংলাদেশের অবস্থানের কারণে সেখানে ইন্টারনেট ব্যান্ডইউথ পৌঁছতো অনেকটা ঘুরপথে। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে, নরেন্দ্র মোদি সরকার বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন সেই ২০১৫ সালে। চুক্তিটি হয়েছিল ভারতের বিএসএনএল ও বাংলাদেশের বিএসসিপিএলসি-র মধ্যে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলস পিএলসি কক্সবাজার ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে আখাউড়া সীমান্ত হয়ে ভারতের আগরতলা নোডে ১০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ লিঙ্ক সংযোগ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এটি ২০ জিবিপিএস-এ উন্নীত করা হয় এবং মেঘালয়, আসাম-সহ উত্তর-পূর্বের অন্যান্। রাজ্যও এর সুবিধা পেতে শুরু করে। কিন্তু ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পেমেন্টের সমস্যা দেখা দেয়। বিএসএনএলের আর্থিক সংকটের কারণে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেবা স্থগিত হয়েছিল। তবে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন চুক্তির মাধ্যমে তা আবার চালু হয়। জানা যায়, ভারত সরকার তখন থেকেই বিকল্প ও সাশ্রয়ী পথ খোঁজা শুরু করেছিল। এরপর বাংলাদেশে পালাবদলের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে যায়। ইউনূস সরকার ভারতকে ইন্টারনেট ব্যান্ডইউথ দিতে অস্বীকার করে।
এই সময়ে ভারত উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যে ইন্টারনেট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশের জন্য বাংলাদেশের উপর নির্ভরশীল ছিল। বিএসএনএল নিশ্চিত করেছে যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সমস্ত ইন্টারনেট ট্র্যাফিক এখন ভারতীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে। জানা যাচ্ছে, ভারত সরকার গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতকে হাইস্পিড অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক এবং স্যাটেলাইট লিঙ্কের মাধ্যমে যুক্ত করেছে। ওয়াকিবহাল মহল বলছে, ২০১৫ সালে মোদি ও হাসিনার মধ্যে এ সংক্রান্ত যে চুক্তি হয়েছিল, তাতে বাংলাদেশ যেমন ত্রিপুরা এবং অন্যান্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ সরবরাহ করে, তেমনই বিনিময়ে ভারত বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ এবং অন্যান্য সম্পদ দিয়ে সহায়তা করতো। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা দাবি করছেন, এই চুক্তি সমাপ্তির অর্থ হল টেলিকম খাত থেকে বার্ষিক রফনিতে প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়ল বাংলাদেশ। তেমনই ভারতের সেভেন সিস্টার্সের মানুষজন পুরোপুরি ডিজিটাল স্বাধীনতা উপভোগ করবেন। আবার ভারতের ডিজিটাল সুরক্ষাও মজবুত হবে। এটা বলাই যায়, ভারতকে প্যাচে ফেলতে গিয়ে নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মারলেন মুহাম্মদ ইউনূস।












Discussion about this post