বাংলাদেশে অভ্যুত্থানপন্থীদের একজনকেই ভয়, তিনি হলেন শেখ হাসিনা। মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর উপদেষ্টারা যেমন এই তালিকায় আছেন, তেমনই বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শীর্ষনেতারাও একটা বিষয়ে একমত। যেমন বিএনপি, জামাত বা এনসিপি। এই মুহূর্তে তাঁদের একটাই প্রয়াস, কোনও ভাবেই যাতে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে ফেরত আসতে না পারে। কিন্তু শেখ হাসিনা, পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ। তিনি জানেন, কিভাবে ছাই চাপা আগুনকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গে পরিণত করতে হয়। তাই তাঁর সরকার পতনের মাস ছয়েকের মধ্যেই তিনি কাজে নেমে পড়েন। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে কোনও অজ্ঞাত স্থানে বসে তিনি গোটা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের ক্রমাগত উৎসাহিত করে গিয়েছেন। তাঁর ওয়াররুমে সর্বক্ষণই চলছে নানা আলাপ আলোচনা। সোশ্যাল মিডিয়ায় দায়মুক্তি নামে যে অনুষ্ঠান করেন শেখ হাসিনা, সেটাই একটা মাস্টারস্ট্রোক বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। সম্প্রতি তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় এক বার্তা দিয়েছেন। তাতে তিনি বেশ কয়েকটি বিষয়ে বলেছেন। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নানা পরামর্শ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার করতে হবে শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশে কোথায় কোথায় উন্নতি হয়েছে। গরীবদের জন্য শেখ হাসিনা কি কি কাজ করেছেন। আর ইউনূসের আমলে সেই প্রকল্পগুলির এখন কি অবস্থা। তাতেই সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবেন কে ঠিক ছিল, আর কে ভূল।
এটা তো বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ সমীকরণ নিয়ে শেখ হাসিনার বিশ্লেষণ। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চেও হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী লীগের সমর্থক ও নেতারা তীব্র লড়াই দিচ্ছেন। একটা ছায়া প্রশাসন তৈরি করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের পর্দাফাঁস করছেন আওয়ামী সৈনিকরা। তাতেই আসছে সাফল্য। যেমন, বেস কয়েকটি দেশ মুহাম্মদ ইউনূসকে কূটনৈতিক রক্ষাকবচ দিতে অস্বীকার করেছে। আবার বহু দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা তাঁর সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করেননি। ৬টি শীর্ষ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ইউনূসকে খোল চিঠি দিয়েছে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য। সর্বশেষ বড় ধাক্কা দিল এক মুসলিম দেশ সৌদি আরব। আগামী ২৭-২৯শে অক্টোবর সৌদি আরবের রিয়াদে ‘নাইনথ এডিশন অফ দ্য ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ নামে এক অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা ছিল প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের। কিন্তু আচমকা সেই সফর বাতিল করতে হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারকে। বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ মুহাম্মদ ইউনূসকে সাদরে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, গত জুলাই মাসে সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফের বিন আবিয়াহ বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার কাছে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের আমন্ত্রণপত্রটি পাঠিয়েছিলেন। ২০১৭ সাল থেকে চলা এই অনুষ্ঠানে এটাই ছিল বাংলাদেশের কোনও রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রথম আমন্ত্রণ। সেই মতো এফআইআই-এর ওয়েবসাইটেও ড. ইউনূসকে সাস্টেইনেবল স্পিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। ২৬ অক্টোবর রাতেই সৌদির বিমান ধরার কথা ছিল মুহাম্মদ ইউনূসের। কিন্তু এরমধ্যেই বিরাট পটপরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সৌদি কর্তৃপক্ষ এই সফরের প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য বলে জানিয়ে দিয়েছে। এর কারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে তিনি জানান, এটি একটি দ্বিপাক্ষিক সিদ্ধান্ত হতে পারে।
ওয়াকিবহাল মহল বলছে, সৌদি আরব বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্সের উৎস। সৌদি-সহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের শ্রমিক রফতানির প্রধান বাজার। বর্তমানে কেবলমাত্র সৌদিতেই লক্ষাধিক বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মরত। কিন্তু বিগত কয়েকমাসে অবৈধ বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে সৌদিতে। এমনকি তাঁরা বাংলাদেশিদের ভিসা দিতেও কড়াকড়ি করছে। এই আবহে প্রধান উপদেষ্টার সফর বাতিল বিষয়টিকে অন্যমাত্রা দিয়ে দিল। বাংলাদেশি কূটনীতিকরা বলেছেন, শেখ হাসিনার আমলে সৌদির সঙ্গে অত্যন্ত উষ্ণ সম্পর্ক ছিল, কিন্তু তা ছিল অর্থনৈতিক স্বার্থভিত্তিক। তবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, আওয়ামী লীগ সরকার ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতে সৌদি কর্তৃপক্ষ সতর্কতা অবলম্বন করেছে। যা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে বড় ধাক্কা।












Discussion about this post