এই মুহূর্তে বাংলাদেশ সফর করছেন পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সেনাপতি জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আসিম মুনিরের পরেই পাক সেনাবাহিনীতে যার পদমর্যাদা। তিনি পাক সেনাবাহিনীর জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান। বাংলাদেশে তাঁর ব্যস্ততম কর্মসূচির মধ্যে তিনি সাক্ষাৎ করেছেন সে দেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে। সৌজন্য সাক্ষাতকালে মুহাম্মদ ইউনূস পাক সেনাকর্তার হাতে তুলে দিয়েছেন একটি পুস্তিকা। যার নাম ‘আর্ট অফ ট্রায়াম্ফ’। আর ওই পুস্তিকার প্রচ্ছদের ছবি নিয়েই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। একটা বিষয় ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে, বাংলাদেশ মনেপ্রাণে চাইছে ভারতের সঙ্গে পায়ে পা বাঁধিয়ে একটা যুদ্ধ লাগাতে। এমনটাই মনে করছেন প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। কেন এ কথা তাঁরা মনে করছেন? তার উত্তর লুকিয়ে ওই ‘আর্ট অফ ট্রায়াম্ফ’ পুস্তিকার মলাটেই।
পাকিস্তানের জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান, জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। সেখানেই পাক জেনারেলের হাতে তুলে দেওয়া পুস্তিকার প্রচ্ছদে দেখা গেল বাংলাদেশের বিতর্কিত মানচিত্র। সেই মানচিত্রে ভারতের অসম এবং অন্যান্য উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিকে বাংলাদেশের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। যা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। অবশ্য এটাই প্রথম নয়, বাংলাদেশের নতুন নোটেই এরকমই বিতর্কিত মানচিত্র ছাপিয়েছিল ইউনূস সরকার। এবার পাক সেনাকর্তাকে দেওয়া বইয়ের মলাটে সেই একই মানচিত্র দেখানো হল। আর সেটা ঘটা করে ছবি তুলে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে শেয়ারও করেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী প্রশাসন। ওই পুস্তিকার প্রচ্ছদে বাংলাদেশের একটি ম্যাপ দেখানো হয়েছে, তাতে ভারতের উত্তর পূর্বের সাতটি রাজ্য যা সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত সেটাও বাংলাদেশের মধ্যে ঢুকিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, বহুদিন ধরেই চরমপন্থি ইসলামি দলগুলি ‘বৃহত্তর বাংলাদেশে’র অংশ হিসেবে এই রাজ্যগুলিকে তাঁদের অংশ বলেই প্রচার করছে। এমনকি মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও বেশ কয়েকবার ভারতের সেভেন সিস্টার্সকে নিয়ে হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু নয়া দিল্লি ওই হুমকিকে যে খুব একটা পাত্তা দেয়নি সেটা বুঝিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এবার ইউনূস যা কাণ্ড ঘটালেন, সেটা নিয়ে আর ভারতের চুপ থাকাটা কঠিন হয়ে যাবে বলেই মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে এই ছবি সামনে আসার পর থেকে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এখনও এই বিষয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি। উল্লেখ্য, মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক দিন দিন উন্নতি হচ্ছে। বিশেষ করে সামরিক ক্ষেত্রে দু-দেশের সখ্যতা নিয়ে ভারত চিন্তিত। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার যমুনা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক কর্তা জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা। যা দুই দেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারী থেকে পাকিস্তানি জেনারেল এবং ব্রিগেডিয়াররা কার্যত ধারাবাহিকভাবেই বাংলাদেশ সফরে আসছেন। আবার বাংলাদেশেরও কয়েকজন সামরিক কর্তা পাকিস্তান সফরে গিয়েছেন। মজার বিষয় হল, দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে কথা হলেও এখনও পর্যন্ত মাত্র দুই বা তিনবার করাচি থেকে কোনও জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে। তাহলে বাণিজ্য যে এই সম্পর্কে প্রাধান্য পাচ্ছে না, সেটা বলাই বাহুল্য। বরং ওই জাহাজে ঠিক কি এসেছিল চট্টগ্রামে, সেটা নিয়েও রয়েছে রহস্য। কারণ কোনও রকম নিরাপত্তা পরীক্ষা ছাড়াই করাচি থেকে আসা জাহাজের পণ্য খালাস করা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ইউনূস প্রশাসনের নেপথ্যে রয়েছে জামায়তে ইসলামীর মতো কট্টরপন্থী দল। আর পাকিস্তানপন্থী এই শক্তিগুলিই ইউনূসকে বাধ্য করাচ্ছে ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ট করতে। তারই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা আমরা দেখতে পাচ্ছি। পাক জেনারেল মির্জার প্রথম বাংলাদেশ সফর। তিনি প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনার প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম কামরুল হাসানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। উল্লেখ করার বিষয় হল, পাক জেনারেল মির্জা সব শেষে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের সঙ্গে একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। অর্থাৎ, এই সফরে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান কোনও গুরুত্ব পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, মুহাম্মদ ইউনূসের একের পর এক কর্মকাণ্ড ভারতকে ক্রমাগত উস্কে চলেছে। ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এবার নয়া দিল্লি কোনও কঠোর অবস্থান নিতে পারে। এমনিতেই ভারতীয় উপমহাদেশে একটা যুদ্ধের বাতাবরণ তৈরি হয়েই আছে। এবার সেই আবহে যুক্ত হয়ে যাবে বাংলাদেশও। কারণ, পাক জেনারেলদের ঘনঘন বাংলাদেশ সফরের একটাই উদ্দেশ্য, বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে ভারতের উত্তরপূর্বের সেভেন সিস্টার্স আক্রমণ করা। যার ইঙ্গিত দিচ্ছেন মুহাম্মদ ইউনূস।












Discussion about this post