২০২৪ সাল ছিল বাংলাদেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ বছর। কারণ নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা পঞ্চম মেয়াদের শপথ নেওয়ার সাত মাসের মধ্যেই তাঁকে এবং তাঁর সরকারকে উৎখাত করা হয় বাংলাদেশে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গোটা বিশ্ব দেখেছিল বাংলাদেশে ঠিক কি হয়েছে। শেখ হাসিনা সেদিন শুধু পদত্যাগই করেননি, বরং বাংলাদেশ ছেড়ে পালাতেও বাধ্য হন। যদিও তাঁর পদত্যাগপত্র নিয়ে পরবর্তী সময় বিতর্ক তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। হাসিনা যে পদত্যাগ করেননি, সেটা তিনি নিজেই দাবি করেছেন। এমনকি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিও স্বীকার করেন তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কোনও পদত্যাগপত্র হাতে পাননি। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারও হাসিনার পদত্যাগপত্র দেখাতে পারেনি। যদিও ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বিভিন্ন ইসলামী উগ্রপন্থী সংগঠন এবং কয়েকটি রাজনৈতিক দলের তত্ত্বাবধানে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ জুন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে সে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় লড়াই করা মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের পর এক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল। যা কোটা বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। এবং পরবর্তী সময় এই আন্দোলন হাসিনা-হঠাও আন্দোলনে পর্যবসিত হয়।
২০২৪ সালের জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে বাংলাদেশজুড়ে ছিল এক চুরান্ত অরাজকতা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। কোটা বিরোধী আন্দোলন থেকে হাসিনা হঠাও আন্দোলন হয়ে ওঠে হিংস্যাত্মক। কয়েক হাজার মানুষের প্রাণ যায় এই তিন মাসে। আহতের সংখ্যা দশ হাজারের বেশি। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই কিন্তু সরকারি চাকরিতে মুক্তি যোদ্ধার পরিবারের কোটা ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করেছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন ৯৩ শতাংশ পদ এখন মেধার ভিত্তিতে পূরণ করা হবে। বাকি দুই শতাংশ প্রতিবন্ধী, জাতিগত সংখ্যালঘু এবং হিজড়া ব্যক্তিদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। তবুও কেন তাঁকেই টার্গেট করা হল, সেটা প্রথমদিকে স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু এখন তা অনেকের কাছেই স্পষ্ট। আসলে বাংলাদেশে অতি গোপনে বেড়ে ওঠা ইসলামিক শক্তিগুলি চাইছিল না শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকুক। কারণ, তিনি একের পর এক কট্টরপন্থী ইসলামিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তাঁদের শীর্ষনেতাদের জেলে পুরেছিলেন। এমনকি জামায়তে ইসলামীর মতো দল এবং তাঁদের ছাত্র সংগঠনকেও তিনি নিষিদ্ধ করেছিলেন। এটাই ছিল শেখ হাসিনার একমাত্র অপরাধ। তিনি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে জেনারেশন জেড-এর যে বিশাল আন্দোলন শুরু হয়, তার পিছনে রয়েছে বিদেশী অর্থ ও মস্তিস্ক। মুলত মার্কিন ডিপ স্টেট ও পশ্চিমা দেশগুলি চেয়েছিল শেখ হাসিনার পতন। আর তাঁদের কাজ আরও সহজ করে দেয় জামায়তে ইসলামী বাংলাদেশ।
বিগত ১৫ মাসে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের কোনও নাম-গন্ধ নেই। মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি একাধিকবার নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করেছেন। এবার তিনি ঘোষণা করেছেন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচন করাবেন। কিন্তু সেই আশা কার্যত নেই বলেই মনে করছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। কারণ, সেই জামায়তে ইসলামী চায় না বাংলাদেশে দ্রুত নির্বাচন হোক। তার আগে জামাত শিবির চাইছে, নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন আরও সাজিয়ে নিতে। পাশাপাশি বাংলাদেশে ইসলামিক ভাবধারার প্রসার আরও বাড়িয়ে নিতে চাইছে জামাতের ছত্রছায়ায় থাকা একাধিক কট্টরপন্থী ইসলামিক সংগঠন। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাতের পর, ২৮ আগস্টই জামায়াতের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। ১৯৭১ সালে নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সাহায্য করার জন্য মিলিশিয়াবাহিনী গঠন করেছিল। তাঁরা একদিকে যেমন পাকিস্তান সেনাকে যুদ্ধে রসদ ও গোলাবারুদ জুগিয়ে সাহায্য করেছিল, অন্যদিকে বহু নারীর ইজ্জত ও সম্ভ্রম নষ্টের পিছনেও তাঁদের হাত ছিল। দাবি করা হয় সংখ্যাটা লক্ষাধিক। ২০১৩ সালে, পাকিস্তানি শাসন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য জামায়াতের বহু নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়। ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল গঠনও করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের শাস্তির আওতায় আনার জন্য। কিন্তু ইউনূস ক্ষমতায় এসেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একাধিক নেতাকে জেল থেকে ছেড়ে দেন। আর সেই আদালতেই এথন হাসিনার বিচার করা হচ্ছে। সবটাই চলছে জামায়তে নেতাদের বলে দেওয়া পথে। এমনটাই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। তবে একটি মহল এমনটাও দাবি করছেন, ভারতের চাপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এবার বাংলাদেশ নিয়ে পিছু হটতে শুরু করেছে। কারণ, ইউনূস থাকলে বাংলাদেশে যে ভোট হবে না, এটা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। তাই হাসিনা ফিরবেন আর ইউনূস যাবেন।












Discussion about this post