স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত মোট তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ছিল প্রশাসনিক এবং একটি সাংবিধানিক গণভোট। বাংলাদেশে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। সেবার প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকার্যের বৈধতা যাচাইয়ের জন্য হয়েছিল গণভোট। সেবার বাংলাদেশের ২১ হাজার ৬৮৫টি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে ৩ কোটি ৮৪ লক্ষ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন। দেখা গিয়েছিল জিয়াউর রহমানের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ৯৮ শতাংশ মানুষ এবং বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন মাত্র ১ শতাংশ মানুষ। দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। সেবার ছিল আরেক বিতর্কিত সেনাশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের যুগ। তাঁর নীতি ও কর্মসূচির বৈধতা যাচাইয়ের জন্য নেওয়া হয়েছিল এই গণভোট। সেবারও বাংলাদেশের ৯৪ শতাংশের বেশি ভোটার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। এরপর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এক গণআন্দোলনের মুখে পড়ে পদত্যাগ করেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ওই বছরই ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে তৃতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সেবার ছিল বিএনপির শাসন। সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর গুরুত্বপূর্ণ বিলে রাষ্ট্রপতি সম্মতি দেবেন কি না, তা নির্ধারণের জন্যই গণভোট নিয়েছিল তৎকালীন বিএনপি সরকার। সেবার গণভোটে অংশগ্রহণ করেছিলেন প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোটার। যেখানে ৮৪ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’-তে ভোট দিয়ে সংসদীয় প্রজাতন্ত্রকে সমর্থন করেছিলেন। বিপক্ষে ভোট পড়েছিল ১৫ শতাংশের সামান্য বেশি। ৩৫ বছর পর আবারও বাংলাদেশে গণভোটের দাবি উঠছে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নিয়েছিল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সরকারের গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের বৈধতা নিশ্চিত করতে গণভোটের প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু এবার বিএনপি নারাজ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘গণভোট’ প্রসঙ্গ। কিন্তু বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র দুই দল এই গণভোটকে কেন্দ্র করে বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন উত্তাপ ছড়াচ্ছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট কখন হবে তা নিয়ে। বিএনপির দাবি, তাঁরা বরাবরই সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রয়েছেন। বিএনপি গণভোটও চায়, তবে সেটি হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন। ঠিক এর উল্টো সুর জামায়তে ইসলামী বাংলাদেশের কন্ঠে। জামায়াত ইসলামী-সহ কয়েকটি দল চলতি নভেম্বর মাসেই গণভোট করাতে চাইছে। আর এই দু’টি বড় রাজনৈতিক দলের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে তৈরি হয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক সংকট। কেউ কেউ মনে করছেন, এর জেরে বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচনও পিছিয়ে যেতে পারে। ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলো এ নিয়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে। যদিও এই জটিলতার দায় সরাসরি অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়েই চাপিয়ে দিচ্ছে বিএনপি। ফলে এর সমাধান ইউনূস সরকারকেই করতে হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে খালেদা জিয়ার দল।
অন্যদিকে বিএনপির নেতা সালাহউদ্দিন আহমদের দাবি, ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার বদলে অনৈক্য প্রতিষ্ঠার একটা চেষ্টা করছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। তাঁর আরও দাবি, বিএনপি-সহ বিভিন্ন দলের তরফে দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ গণভোটের জন্য রাখা হয়নি। যে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলো সই করেছে, সেই স্বাক্ষরিত সনদ বহির্ভূত অনেক পরামর্শ বা সুপারিশ, সনদ বাস্তবায়নের আদেশের খসড়ায় যুক্ত করা হয়েছে। অথচ ঐকমত্য কমিশনে যা আলোচনা হয়েছে, তা সুপারিশে নেই। বিএনপি এই দাবি করলেও জামাত অনড় নভেম্বরে গণভোট করানো নিয়ে। দলটির শীর্ষনেতা জামায়াতে ইসলামির মহাসচিব মিয়াঁ গোলাম পরওয়ার সরাসরি দাবি করেন, নভেম্বরের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোট করতে হবে। সেই সঙ্গে বিএনপিকে খোঁচা দিয়ে তিনি বলেন, যারা জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট চায়, তারা জুলাই সনদকে অকার্যকর করতে চায়। পরিস্থিতি যে দিকে এগোচ্ছে তাতে একটা বিষয় স্পষ্ট, বিএনপি ক্রমশ অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধ অবস্থান নিচ্ছে। ফলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়েই প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিচ্ছে।












Discussion about this post