গত ১০ নভেম্বর দিল্লির লালকেল্লায় বিস্ফোরণে বাংলাদেশের জড়িত থাকা এবং বাংলাদেশের মাটি ব্যবহারের বিষয়ে একাধিক যোগসূত্র পাচ্ছেন তদন্তকারী সংস্থাগুলি। যদিও দিল্লি বিস্ফোরণের পরই ভারতীয় গণমাধ্যমে এই বিষয়ে খবর প্রকাশিত হতেই ফুঁসে উঠেছিল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই পাকিস্তান, তুর্কির পাশাপাশি বাংলাদেশের জড়িত থাকার একাধিক বিস্ফোরক তথ্য ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ-র হাতে আসছে। তদন্তের গতি যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততই বাংলাদেশের একাধিক যোগসূত্র পাচ্ছেন তদন্তকারীরা। বলা ভালো ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলি ঢাকার ভূমিকার দিকে ইঙ্গিত করে ক্রমশ প্রমাণ পাচ্ছে। দিল্লি বিস্ফোরণের সূত্রগুলি ঘাঁটতে গিয়ে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ এর মধ্যে গভীরভাবে জড়িত। সংস্থাগুলি বিস্ফোরণের কয়েকদিন আগে লস্কর-ই-তৈয়বা (এলইটি) শীর্ষ কমান্ডার সাইফুল্লাহ সাইফের বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা এবং সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির শীর্ষনেতাদের সাথে একটি বৈঠকের দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করেছেন। ডঃ আসিফ নজরুল, যিনি বাংলাদেশের আইন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। তাঁর সাথেও বৈঠক করেন লস্কর-ই-তৈয়বার বাংলাদেশ মডিউল প্রধান হারুন ইজহার। এখানেই শেষ নয়, ভারতীয় গোয়েন্দা সুত্রগুলির মতে, দিল্লি বিস্ফোরণের কয়েক দিন আগে, অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহে লস্কর-ই-তৈবার শীর্ষ কমান্ডার সাইফউল্লাহ সাইফ ঢাকার অভিজাত এলাকা বানানির এক বৈঠকে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়েছিলেন।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যাচ্ছে, লস্কর কমান্ডার সাইফউল্লাহ সাইফ যখন পাকিস্তান থেকে ভার্চুয়ালি এই বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন, তখন বাংলাদেশের সাতজন শীর্ষ জঙ্গিনেতা সরাসরি বনানিতে উপস্থিত ছিলেন। এরা হলেন নিষিদ্ধ ইসলামিক সংগঠন হিজবুত তাহরিরের ঢাকা প্রধান জুবায়ের আহমদ চৌধুরী এবং সাইফের ডান হাত এবং মারকাজ-ই জামিয়ত আহলে-হাদিসের সাধারণ সম্পাদক ইবতিসাম ইলাহি জাহির। এছাড়া ছিলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব ড. নাসিরুল গণি; ঢাকা উত্তর কর্পোরেশনের সিইও এবং হিজব-উল-তাহরিরের সমন্বয়কারী মোহাম্মদ আজাজ; জঙ্গি গোষ্ঠী আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের উপ-প্রধান হাফিজ শুজাদ্দুল্লাহ এবং হাফিজ আলি ফজল এবং বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ। জানা যাচ্ছে, ওই বৈঠকে লস্কর কমান্ডার সাইফ ভারতে বড় আকারের সন্ত্রাসী হামলা চালানো এবং পাকিস্তান থেকে কি ধরণের সাহায্য করা হবে সে সম্পর্কে নিজের বক্তব্য রাখেন। এমনকি এই বিষয়ে বাংলাদেশের ওই মডিউলটিকে প্রয়োজনীয় অপারেশনাল নির্দেশও দেন। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ছিল ওই বৈঠকে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা, বেসামরিক কর্মচারী স্বরাষ্ট্র সচিব ড. নাসিরুল গণি এবং ঢাকা উত্তর কর্পোরেশনের সিইও মোহাম্মদ আজাজের উপস্থিতি। যা দিল্লি বিস্ফোরণে বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি যোগাযোগের প্রমান হিসেবে দেখা হচ্ছে। একাধিক সূত্র বলছে, বৈঠকের পরে, বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ-সহ একটি দল পশ্চিমবঙ্গ এবং দেশের অন্যান্য অংশে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য লোকজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে নভেম্বরের প্রথম দিকে মুর্শিদাবাদ হয়ে ভারতে ঢোকে। এবং মুর্শিদাবাদে তারা সবাই জনৈক ইকতিয়ারের নিরাপদ আস্তানায় ছিল বলেই জানতে পারছেন তদন্তকারীরা। এই ইকতিয়ার একজন বাংলাদেশি নাগরিক। যিনি বাংলাদেশের গোয়েন্দা শাখার একজন কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত এবং পলাতক। এই ইকতিয়ারের খোঁজেই মুর্শিদাবাদে তল্লাশি চালাচ্ছে এনআইএ টিম।
অন্যদিকে, হারুন ইজহার, একজন সুপরিচিত জিহাদি ব্যক্তিত্ব যার বাংলাদেশের মাটি থেকে সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্রের কুখ্যাত ইতিহাস রয়েছে—যার মধ্যে ২০০৯ সালে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে ব্যর্থ হামলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সূত্রের মতে, ঢাকায় আসিফ নজরুলের আইন মন্ত্রণালয়ের কার্যালয়েই অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি ভারতীয় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা মহলকে হতবাক করে দিয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে নজরুল এবং ইজহারের মধ্যে সাক্ষাৎ রেকর্ড করা হয়েছে, যদিও তাদের কথোপকথনের বিস্তারিত তথ্য এখনও গোপন রাখা হয়েছে। ওই সূত্র দাবি করেছে, এটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মধ্যে উগ্রপন্থী উপাদান এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে বিপজ্জনক ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত দেয়।
সবশেষে আসা যাক, জসিমুদ্দিন রাহমানী প্রসঙ্গে। তিনি কট্টরপন্থী ইসলামী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা এবিটি-র প্রধান। এবিটি হল বিশ্ব সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদা এবং এর শাখা আল কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্টের সক্রিয় শাখা। শেখ হাসিনার পতনের কয়েকদিন পরই এই উচ্চ পর্যায়ের জঙ্গিনেতাকে জেল থেকে ছেড়ে দেয় মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। আর জেল থেকে ছাড়া পেয়েই রহমানী যা বলেছিলেন, সেটা তখনই ভাইরাল হয়েছিল। তিনি কাশ্মীর ও খালিস্তানের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি ভারতের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে বাংলাদেশে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। এই এবিটি-র এক শীর্ষ নেতাও লস্কর কমান্ডার সাইফউল্লাহ সাইফের ভার্চুয়াল বৈঠকে উপস্থিত ছিল। সবমিলিয়ে দিল্লি বিস্ফোরণে বাংলাদেশের শক্তিশালী যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন ভারতের তদন্তকারী সংস্থাগুলি। ফলে অপারেশন সিঁদুরের দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে এখন জোর চর্চা চলছে প্রতিরক্ষা মহলে, এবার কি তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশেও অপারেশন সিঁদুর?












Discussion about this post