বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের কলমের খোঁচায় বদলে গেল সে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। কার্যত ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল বললেও অত্যুক্তি হবে না।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বৃহস্পতিবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পক্ষে রায় দিল। সে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ রায় দেন। সিলমোহর দেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায়। ১৯৯৬ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পরে হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্বে নির্বাচন ব্যবস্থা বাতিল করে দেন। বাংলাদেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের ফলে আওয়ামী লীগ কিছুটা হলেও ব্যাকফুটে চলে গেল। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের নির্বাচনে অংশ নেবে না।
গত বছর হাসিনা সরকারের পতনের পর তত্ত্বাধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবিতে মামলা হয় হাইকোর্টে। হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনার দাবি খারিজ করে দেয়। হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মামলা দায়ের হয় সুপ্রিম কোর্টে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে আদালতে মামলা করেছিলেন আইনজীবী শরিফ ভুঁইয়া ৷ সেই মামলায় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ৭ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত রায় দেয়। মামলার অন্যতম শরিক ছিল বিএনপি এবং জামাত-ই ইসলামি। এছাড়া নির্বাচন সংক্রান্ত সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান বদিউল আলম মজুমদার সহ নাগরিক সমাজের একাধিক জন এই মামলায় যুক্ত ছিলেন। শেখ হাসিনার বিগত ১৫ বছরের শাসনে বিএনপি সহ বিরোধী দলগুলি বারে বারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি করলেও আওয়ামী লিগ সরকার তা মানেনি। হাসিনা সরকারের বক্তব্য ছিল, সংবিধানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান নেই।
তত্ত্বাধায়ক সরকার সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট কী রায় দেয়, সে দিকে তাকিয়ে ছিল গোটা দেশ। অনেকেই আশা করেছিলেন রায় যাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে। রায় হাসিনার বিপক্ষে যাওয়ায় অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে নাটের গুরুঠাকুর কে? সুপ্রিম কোর্টের রায় চূড়ান্ত। তাই এই রায় শিরোধার্য করাই দস্তুর। আইনজীবী শরিফ ভুঁইয়া বলেন, “সংবিধানের আওতায় সংসদ ভেঙে দেওয়ার ১৫ দিনের মাথায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করতে হবে ৷ কিন্তু এক বছর আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে ৷ তাই এই ব্যবস্থা এখন কার্যকর করা যাবে না৷”
১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কার্যকর হয় ৷ পরপর দু’টি নির্বাচন হয়েছিল দুই অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির নজরদারিতে ৷ ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন পর্ব মিটে গেলে জয়ী দলের হাতে সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছিল ৷ ২০০৪ সালে সংসদীয় নির্বাচন হয়েছিল দেশের সেনা সমর্থিত অন্তর্বর্তী প্রশাসনের নেতৃত্বে ৷ যাঁর প্রধান ছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নর ৷ সেবার শান্তিপূর্ণ ভোট হয় এবং হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসীন হয় ৷ কিন্তু শেখ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলে তা হবে শুধুমাত্র নির্বাচনকালীন তিন মাসের জন্য। বাংলাদেশের সংবিধানে ১৯৯৬ সালে নির্বাচনকালীন এই ধরনের সরকার গঠনের বিধান যুক্ত হয়েছিল। বিএনপি জামানায় চালু ওই বিধান নিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের ইতিহাস রয়েছে। হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করে দেয়৷
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন কোন দিকে মোড় নেয়, সে দিকে তাকিয়ে সব পক্ষ।












Discussion about this post