দিল্লিতে অজিত ডোভাল–খলিলুর রহমান বৈঠকে আচমকাই ঢুকে পড়েন মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর। জানা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ের নিরীখে অতি গুরুত্বপূর্ণ ওই বৈঠকের দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এবং আরও কয়েকজন বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। ওই বৈঠকে ভারতের কয়েকজন সেনাকর্তাও ছিলেন, পাশাপাশি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল তো ছিলেনই। বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে, এটা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটা বৈঠক। ফলে স্বভাবতই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন খলিলুর-সহ বাংলাদেশের অন্যান্য প্রতিনিধিরা। ভারত–আমেরিকার যৌথ নিরাপত্তা বার্তায় কার্যতই চাপে পড়ে গিয়েছে বাংলাদেশ। তাঁরা যে সত্যিই চাপে পড়েছে তা বোঝা গিয়েছে দিল্লি সফর কাঁটছাঁট করে খলিলুরের দ্রুত ঢাকা ফিরে যাওয়া। এখন প্রশ্ন উঠছে, এখন কেন ওয়াশিংটন ভারতের পাশে শক্তভাবে দাঁড়াতে চাইছে?
বিগত কয়েকমাস ধরে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে সম্পর্ক নরমে-গরমে চলছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একাধিক বয়ান ভারত এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চাপে ফেলেছিল। অথচ এই ডোনাল্ড ট্রাম্পই দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট পদে বসেই নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করেন, এবং “মাই ফ্রেন্ড, মাই ফ্রেন্ড” বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ফলাও করে লেখেন। এরপরেও নেতিনইয়াহুর পর মোদিকে ওয়াশিংটনে ডেকে বৈঠকও করেন। তখন তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী মোদি দেখে নেবেন। কিন্তু তারপরই বাণিজ্য এবং ট্যারিফের ভূত চেপে বসলো ট্রাম্পের মাথায়। ফলে একাধিক দেশকে তিনি হুমকি দিলেন, উচ্চ শুল্ক বা ট্যারিফ বসিয়ে সেই দেশগুলিকে নিজের বসে আনার চেষ্টা করলেন। কিন্তু একমাত্র বাঁধ সাধলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর পাল্টা চালে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করলো। ভারতের মতোই একাধিক দেশ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে পাল্টা দিলেন। ট্রাম্প ভারত ও পাকিস্তানের চারদিনের যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব নিয়েও একশোবারের বেশি দাবি করেছেন। কিন্তু ভারত কার্যত তা নাকচ করে দিয়েছে। সবমিলিয়ে ভারতের কাছে কার্যত নাকানিচোবানি খেতে হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। আর এতে জলের মতো সময় পার হয়েছে। তাতে ধাক্কা খেয়েছে মার্কিন অর্থনীতি। কারণ, ভারতের উপর ৫০ শতাংশ ট্যারিফ চাপানোয় আমেরিকার বাজারে বহু জিনিসের দাম বেড়েছে। ফলে অসোন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে সে দেশে। আবার ট্রাম্পের ভিসানীতি ও শুল্কনীতির জোড়া ধাক্কায় বহু মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি ভারতে কারখানা খুলতে আগ্রহী হয়ে পড়ে। তাতেও ধাক্কা খায় ট্রাম্পের নীতি। সবমিলিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুঝতে পারেন, ভারতের জন্য ফাঁদ পাততে গিয়ে তিনি নিজেই ধরা পড়েছেন। একইভাবে মার্কিন ডিপ স্টেট এবং জর্জ সোরসের সংস্থাগুলির মাধ্যমে ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনতে চেয়েছিল মার্কিন প্রশাসন। কিন্তু তাতেও খুব একটা সুবিধা হয়নি। ফলে সবদিক থেকেই চাপে পড়ে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এরপরই ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর খুব কাছের লোক সার্জিও গোরকে ভারতের রাষ্ট্রদূত করে পাঠান। তাঁকে আবার দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার বিশেষ দূতও করা হয়েছে। বার্তা একটাই এই অঞ্চলে ভারতের সাথে যোগাযোগ রেখে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেবে ওয়াশিংটন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন ভারতের সাথে পুরোনো সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া, ঠিক তখনই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিল মোদি সরকার। বাংলাদেশকে সবক শেখাতে জরুরি তলব করা হল সে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে, যিনি নিজেও একজন মার্কিন নাগরিক এবং মুহাম্মদ ইউনূসের ডান হাত বলে পরিচিত। আর তাঁকে ডাকা হয়েছে ওয়াশিংটনের মাধ্যমেই। ফলে তড়িঘড়ি খলিলুর দিল্লি চলে আসেন ঘোষিত সফরের একদিন আগেই। এরপরই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল রীতিমতো তথ্যপ্রমান-সহ একটি ডসিয়ের তাঁর হাতে তুলে দেন। বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে জঙ্গি কার্যকলাপ, ভারতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং জঙ্গি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের উপগ্রহ চিত্র এবং ডিজিটাল প্রমান রয়েছে ওই ডসিয়রে। এই ধাক্কা সামলানোর আগেই খলিলুরের সামনে উপস্থিত হন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। পদাধিকার বলে যিনি বাংলাদেশেরও দায়িত্বে। জানা গিয়েছে, বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান জঙ্গি কার্যকলাপ নিয়ে সার্জিও গোরও খলিলুরকে সাবধান করে দেন। এবং ভারতের কথা মতো অ্যাকশন নিতে বলে দেন। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এতক্ষণে টের পেয়ে গিয়েছেন, বাংলাদেশকে কার্যত এতিম বা অনাথ বানিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতের পাশেই দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশ কার্যত সাইডলাইনের ধারে চলে গিয়েছে। মুহাম্মদ ইউনূসের সামনে এখন সময় খুবই কম।












Discussion about this post