একটি প্রদেশকে জোর করে দখল করা, সেই প্রদেশের বাসিন্দাদের সঙ্গে চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতার ফল কী হয়, সেটা এবার বুঝতে পারছে পাকিস্তান। শত হলেও বালোচবাসীরা যে পাঠান। তারা আর পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে চাইছে না। সেখানে লেগেছে বিদ্রোহের আগুন। বালোচকে পাকিস্তানের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার যে ঐতিহাসিক অসন্তোষ, তা প্রজন্মের পর প্রজন্মান্তরে জন্ম দিয়েছে বালোচ জাতীয়তাবাদের। বালোচিস্তানকে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান থেকে আলাদা করতে চাইছে বিদ্রোহীরা। তার জন্য তারা তৈরি করেছে বালোচ লিবারেশন আর্মি। তাদের দমন করতে উঠে-পড়ে লেগেছে পাকিস্তান সেনা। বালোচিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ, সেখানকার বিদ্রোহীরা বারবার পাকিস্তানকে রক্তাক্ত করতে চেয়েছে। যদিও বালোচ বিদ্রোহীদের পালটা আক্রমণে পাকিস্তান সেনা বেসামাল হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি শাহবাজের ঘুম ছুটিয়েছে আরও এক বিদ্রোহী সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান। গুরুতর এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বালোচ সংগঠনও তাদের হামলার ঝাঁজ আরও বাড়িয়েছে।
চলতি বছর সেপ্টেম্বরেই জাফর এক্সপ্রেসে ভয়াবহ একটি বিস্ফোরণ ঘটে। তৎক্ষনাৎ গাড়ির ছটি কামরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিস্ফোরণের জেরে আহত হন একাধিক যাত্রী। তড়িঘড়ি তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল, আইডি বিস্ফোরণের জেরেই এই হামলা। তবে হামলার নেপথ্যে কারা, তা স্পষ্ট হয়নি। তবে তদন্তকারীদের অনুমান, যেহেতু ঘটনাটি বালোচ বিদ্রোহীদের এলাকায় সে ক্ষেত্রে তাদের হাত থাকার সম্ভাবনা কোনওভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে নতুন করে বালোচিস্তান তপ্ত হয়েছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সাত বার কেঁপে উঠেছে সে দেশের মাটি। এখনও পর্যন্ত কোনও সংগঠনের তরফে এই হামলার দায় স্বীকার করা হয়নি। অনুমান করা হচ্ছে বালোচ বিদ্রোহীরাই এই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। দফায় দফায় বিস্ফোরণ ঘটে রাজধানী কোয়েটা এবং ডেরামুরাদ অঞ্চলে। নভেম্বর মাসের শেষ শনিবার প্রথমে পুলিশ চেক পয়েন্টে হামলা হয়েছে। তারপরের হামলা কাউন্টার টেররিজম ডিপার্টমেন্টে। তারপর সন্ধ্যা আরও তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। জানা গিয়েছে কোয়েটার উপকণ্ঠে লোহার ক্যারেজের কাছে রেললাইনেও বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। যার কারণ রেললাইনে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাকিস্তান সেনার বিরুদ্ধে বিমান হামলার অভিযোগ তুলেছে বালোচিস্তান। বালোচিস্তানের আত্মনিয়ন্ত্রণের সমর্থক সংগঠন ‘বালোচ ন্যাশনাল মুভমেন্ট’ (বিএনএম)-এর মানবাধিকার শাখা ‘পঙ্খ’ অভিযোগ করেছে, ওই প্রদেশের রাজধানী কোয়েটার অদূরে চিল্টন পাহাড়ের জনবসতিতে বিমানহানায় ন’জন যুবক গুরুতর জখম হয়েছেন।
বালোচ মানবাধিকার সংগঠনঠির তরফে শুক্রবার রাষ্ট্রপুঞ্জ মানবাধিকার কমিশনের কাছে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়েছে।পাক বিমানহানায় জখন বালোচ যুবকদের তালিকাও শুক্রবার প্রকাশ করেছে তারা। জানিয়েছে, চিল্টন পাহাড়ে পিকনিক করতে গিয়ে পাক যুদ্ধবিমানের নিশানা হয়েছেন স্থানীয় ওই যুবকেরা। ‘পঙ্খে’র অভিযোগ, পাকিস্তানের সেনা এবং প্রশাসন ঘটনাটি আড়াল করার জন্য সক্রিয়।
প্রসঙ্গত, সাত দশক আগে পাকিস্তানি সেনা বালোচিস্তান দখল করেছিল । অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তৎকালীন শাসককে বাধ্য করেছিল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতে। বালোচিস্তানের পরবর্তী ইতিহাস ফের নতুন স্বাধীনতার যুদ্ধের। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর কয়েক হাজার মানুষের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার। পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বালোচিস্তান প্রাকৃতিক ভাবেও সবচেয়ে সম্পদশালী। ধীরে ধীরে তা বেহাত হয়ে যাচ্ছে ভূমিপুত্রদের হাত থেকে। ‘চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর’ (সিপিইসি) তৈরির পরে গত কয়েক বছরে সেই লুট আরও বেড়েছে। পশ্চিম চিনের শিনজিয়াং প্রদেশের কাশগড় থেকে শুরু হওয়া ওই রাস্তা কারাকোরাম পেরিয়ে ঢুকেছে পাকিস্তানে। প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শেষ হয়েছে বালুচিস্তান প্রদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে চিন নিয়ন্ত্রিত গ্বদর বন্দরে।












Discussion about this post