সালটা ২০১৮, তারিখ ১৪ অক্টোবর।
সেদিন মুন্সীগঞ্জের মাওয়া টোলপ্লাজা সংলগ্ন গোলচত্বরে দেশের বৃহত্তম অবকাঠামো পদ্মা সেতু প্রকল্পের অগ্রগতি এবং সেতুতে রেল সংযোগ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘ আমরা পদ্মা সেতু প্রকল্প হাতে নিলে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি এগিয়ে আসে। কিন্তু আমাদের দেশের কিছু মানুষের কাছে ব্যক্তি স্বার্থটাই বড়। তাদের ষড়যন্ত্রের কারণে পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংক মুখ ফিরিয়ে নেয়।’
ভাষণে তিনি ইউনূসের প্রসঙ্গ তোলেন। বলেন, ‘১৯৭৫ সালের পর থেকে ইউনূসের সঙ্গে আমার পরিচয়। তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৯৮ সালে অর্থ সংকটে পড়লে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংকটিকে চারশ’ কোটি টাকা দিই। গ্রামীণ ব্যাংকের আইনে বলা আছে যে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত একজন এমডি পদে থাকতে পারবেন। কিন্তু ইউনূসের বয়স তখন ৭০। তখনও তিনি ব্যাংকের এমডি পদে থাকতে চান। ব্যাপারটি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। কোর্ট থেকে তাঁকে বলা হল – আপনি আর এমডি থাকতে পারেন না। কিন্তু তিনি ক্ষেপে গেলেন।’ তাঁর কথায় ‘একজন নোবেল লরিয়েট সামান্য একটি ব্যাংকের এমডি পদের লোভ ছাড়তে পারলেন না। পদ্মা সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে ষড়যন্ত্র করলেন। এদের মধ্যে দেশপ্রেম নেই। যারা গরিবকে টাকা দিয়ে তার সুদের টাকায় বড়লোক হয়, তাদের মধ্যে কখনও দেশপ্রেম থাকতে পারে না।’
শেখ হাসিনা সেদিন জোর গলায় বলেছিলেন, ‘‘তাদের ধারণা ছিল, বিশ্বব্যাংকের টাকা ছাড়া আমরা পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে পরবো না। কিন্তু দেশের জনগণের প্রতি আমার বিশ্বাস ছিল। এই দেশের মানুষ সব ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে পদ্মা সেতুর জন্য অর্থ দিতে এগিয়ে আসেন।’ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের সেই অমোঘ উক্তি সেদিন স্মরণ করেছিলেন হাসিনা। আর সেই অমোঘ উক্তি হল -আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।’ কেউ দাবিয়ে রাখতে পারেনি। পদ্মাসেতু তৈরি করেছিলেন হাসিনা। বিশ্বব্যাংক কোনওকালেই হাসিনার বন্ধু ছিল না। আজ তারাই হাসিনার গুণগান করতে শুরু করেছে? আর ইউনূসের বদনাম করছে। কিন্তু কেন?
এক কথায় বাংলাদেশকে দায়িত্বের সঙ্গে সব দিক থেকে ডুবিয়ে দিয়েছেন ইউনূস। রাজনৈতিক দিক থেকে তো বটেই, আর্থিক দিক থেকেও। সেটা বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে স্পষ্ট। তারা সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘গোইং বিঅন্ড গ্রোথ: হাউ বাংলাদেশ ক্যান ট্যাকেল প্রভার্টি অ্যান্ড ইনইকুয়ালিটি থ্রু জব ক্রিয়েশন। ’ দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালে ছিল ১৮.৭%। আর সেই হারকে দায়িত্বের সঙ্গে ২১.২ % পৌঁছে দিয়েছেন নোবেল ম্যান। দেশের মোট জিডিপির হার অস্বাভাবিক কমে গিয়েছে। চাকরি নেই। একের পর এক কলখারানা বন্ধ হতে চলেছে। আয় বৈষম্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকি মাথাচাড়া দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংক স্বীকার করে নিয়েছে জলবায়ু অভিযোজনে হাসিনার আমলে বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে প্রমাণিত রোল মডেল। মানবসম্পদের উন্নয়ন হয়েছিল। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশে উৎপাদন খাতে স্থবিরতা এসেছে। বিদেশি বিনিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ। হাসিনা-পরবর্তী আমলে দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি আরও বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে তিন কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছে। তখন ক্ষমতায় ছিলেন কে, তা আমরা জানি। একই সময়ে দুই কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে কৃষির পুনরুদ্ধার মহিলাদের মধ্যে শিক্ষার অগ্রগতির কারণে। হাসিনার আমলে গত তিন মেয়াদে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ধরে রেখেছিল।
২০২৪ সালের পর বাংলাদেশে দারিদ্র্য আবার বাড়তে শুরু করেছে। এই অবস্থার জন্য কে দায়ী, সেটা বিশ্বব্যাংক সরাসরি না বলেও বোঝাই যাচ্ছে তাঁরা কাকে দায়ী করছে।












Discussion about this post